ঢাকা, শুক্রবার   ২২ অক্টোবর ২০২১,   কার্তিক ৬ ১৪২৮

খোকন থৌনাউজাম

প্রকাশিত: ০০:৩৭, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২১
আপডেট: ২০:৪৩, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১

ছবির গল্প

জলময়ূরের সাথে একদিন

বাচ্চা জলময়ূর ও পুর্ণবয়স্ক বাবা জলময়ূর। ছবি: খোকন থৌনাউজাম।

বাচ্চা জলময়ূর ও পুর্ণবয়স্ক বাবা জলময়ূর। ছবি: খোকন থৌনাউজাম।

সতেরো-আঠারো দিন আগে একবার আলমগীর ফোন করে জানিয়েছিলো জলময়ূরের বাসা এবং ডিম পাওয়া গেছে। পরদিন চলে গিয়েছিলাম নিশ্চিত হতে। পরে আরও একটি বাসা এবং ৪টি ডিম চিহ্নিত করা হয়। বলে এসেছিলাম খেয়াল রাখতে, কোন ভাবেই যেনো ডিম এবং বাসা নষ্ট না হয়। প্রজনন মৌসুমে অনিন্দ্য সুন্দর রূপ ধারণ করা লম্বা লেজের পাখিটির ইংরেজী নাম Pheasant-Tailed Jacana।

এটি আইইউসিএন কর্তৃক নূন্যতম বিপদগ্রস্থ আবাসিক পাখি আমাদের।  

বাইক্কা এবং বাইক্কা সংলগ্ন হাওর বিলগুলিতে প্রচুর পাখি শিকার হয়। স্থানীয় মৎস্যজীবীদের অনেকেই এর সাথে সরাসরি জড়িত। প্রধান কারণ শহুরে বাবুদের কাছে পাখির মাংসের চাহিদা ব্যাপক।

শুধু আলমগীরের মতো সাধারণ মৎস্যজীবীদের কাছে সচেতনতার বুলি আওড়ে লাভ নেই। সচেতনতা শুরু হতে হবে শহুরে বাবুদের থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ে।

মাঝির মাথায় শুধু এটাই ঢুকিয়ে দিতে চেয়েছিলাম যে, তুমি যদি এদের আগলে রাখো, তাহলে দেখবে আমার মতো অনেক ফটোগ্রাফার এদের ছবি তুলতে আসবে, তোমাকেই খুঁজবে তারা। তোমার পরিচিতি এবং ব্যবসা দুটাই বাড়বে। 

এর মধ্যেই ঢাকা এবং কুমিল্লার বেশ কয়েকজন স্বনামধন্য ফটোগ্রাফাররা এসে ঘুরেও গেছেন দফায় দফায়। 

সকালে আলমগীর ফোন করে জানালো একটি বাসায় ডিম নেই। ক্ষীণ একটা বাজে ভাবনা যে মনে উঁকি দেয়নি তা নয়। আবার হিসেব-নিকেশ করে এটাও ভেবে পুলকিত হয়েছি যে তাহলে ফুটেছে ছানাগুলি। দেরী না করে চলে গেলাম স্পটে। ১৮-২০ দিনে ডিম ফুটে এদের।

প্রথম বাসায় একটা ডিম আছে, দুইটি নেই! বাবা ময়ুরটা আশে-পাশেই আছে। গলায় সতর্ক সংকেত নিয়ে থেমে থেমে ডেকে চলেছে। হাতের ইশারায় মাঝিকে পিছিয়ে আসতে বলে সূর্যের অবস্থান অনুযায়ী সুবিধাজনক জায়গায় পজিশন নিয়ে বসে রইলাম চুপচাপ।

সতর্ক দৃষ্টি রাখছে বাবা জলময়ূরটা। ছবি- খোকন থৌনাউজাম।

প্রায় ঘন্টাখানেক কড়া রোদের নিচে পুড়তে পুড়তে ক্যামেরা চোখে লাগিয়ে বাবাটার উপর নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছি, সম্ভাব্য স্পট চিহ্নিত করে রেখেছি বাবা পাখিটার পাশের জলজ ঝোপের উপর। বদ্ধমূল ধারণা ছিল ওইখানেই লুকিয়ে আছে ছানাগুলি।

ডিম ফোটানো থেকে লালন পালন সব কিছু করে জল ময়ুরের বাবারাই। মা শুধু ডিম দিয়েই চলে যায়।

হঠাৎ  চোখ ছানাবড়া করে দিয়ে নৌকা থেকে মাত্র ১৫-১৬ হাত দূরে পদ্মপাতার আড়াল থেকে বের হয়ে এলো একটি ছানা। এতক্ষণ এতো কাছে লুকিয়েছিলো বাচ্চাটা! শিট!

কন্টিনিউয়াস মোডে ৩০-৩৫ টা ডকুমেন্ট শট নিয়েই শুয়ে পড়লাম, ইশারা দিতেই মাঝিও একই ভাবে মিশে গেলো নৌকার সাথে। অপেক্ষা করতে লাগলাম। স্নায়ুর উপর চাপ বেড়ে যাচ্ছে, হৃৎপিন্ডের গতি বেড়ে যাচ্ছে উত্তেজনায়।

বাচ্চা জলময়ূর। ছবি- খোকন থৌনাউজাম।

খুব সাবধানী ভঙ্গিমায় পাতার উপর বসে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করলো আমাদের, একসময় হয়ত বুঝতে পারলো আমরা ক্ষতিকারক প্রাণী নই। চোখের সামনে একদম কাছে হেঁটে বেড়াতে লাগলো আমার বহুদিনের কাঙ্খিত জলময়ুরের ছানা।

মাঝেমাঝে এতো কাছে চলে আসছিলো যে ৫০০এমএম এর ভিউফাইন্ডারে চোখ রেখে মনে হচ্ছিলো এইবুঝি লেন্সের সাথে ধাক্কা লেগে গেলো পাখিটি।

পনেরো থেকে বিশ মিনিট ছিলাম ওই জায়গায়। তারপর আস্তে আস্তে পিছু হটে ফিরে আসতে লাগলাম পাড়ের দিকে।

আলমগীর আর আমার দুজনের মুখে তখন একান-ওকান বিস্তৃত হাসি। পাড়ে উঠে  বললাম 'আলমগীর, চলো সরাসরি নুরফুডসে।'

রেস্টুরেন্টে আলমগীরের মুখে বিস্তৃত হাসি।

জলময়ূরের সাথে একদিন | বাইক্কা বিল | ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফি

আইনিউজ/খোকন থৌনাউজাম/এসডি

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়