ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০৯ জুলাই ২০২০,   আষাঢ় ২৪ ১৪২৭

ইয়াসীন সেলিম

প্রকাশিত: ০০:৫৬, ২৩ জুন ২০২০
আপডেট: ০১:০৮, ২৩ জুন ২০২০

কামাল লোহানী: ঘরছাড়া তরুণের পথিকৃত হয়ে ওঠার গল্প

“আমরা বিজয় অর্জন করেছি। পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমাদের মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছে।”

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের বার্তা বিভাগের প্রধান হিসেবে কামাল লোহানীই প্রথম জাতিকে এই বিজয়বার্তা দিয়েছিলেন। তার এই বার্তা পেয়ে সাড়ে সাতকোটি মানুষ বাঁধভাঙা আনন্দে উদযাপন করে বিজয়কে। যাত্রা শুরু হয় স্বাধীন একটি জাতির।

আপাদমস্তক বাঙালি এই তেজী পুরুষ জীবনে আপস করেননি নিজের আদর্শের সাথে। নিজেকে কখনো সাহেব না ভেবে বাঙালিই ভেবেছেন সবসময়। তিনি কতটা বাঙালি ছিলেন একটা ঘটনা থেকেই ধারণা করা যায়। ১৯৭৯ সালে সম্পাদক হিসেবে রাষ্ট্রপতির এনট্যুরেজের সদস্য হয়ে লুসাকা কমনওয়েলথ হেড অফ দি স্টেট কনফারেন্সে যাওয়ার কথা ছিল তার। মিলিটারি সেক্রেটারি তাকে পাঞ্জাবি-পায়জামা ছেড়ে স্যুট-প্যান্ট পরার জন্য বলেন। কিন্তু তিনি অস্বীকৃতি জানান। নিজের পোশাক বিসর্জন দিয়ে ঐ সফরে যেতে চাননি, যানওনি। এমনকি পরে যাতে কেউ অনুরোধ করতে না পারে, সেজন্য খুলে রেখেছিলেন বাসার টেলিফোন লাইনও। এমন বাঙালিয়ানা আজকাল দেখাই যায় না!

একটু পেছনে ফিরে যাই। ১৯৫২ সালে পাবনা জিলা স্কুলের এক মেট্রিক পরীক্ষার্থী হঠাৎ জড়িয়ে পড়েন ভাষা আন্দোলনে। ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় প্রাণ দেন সালাম, বরকত, রফিকেরা। মফস্বল শহর পাবনায়ও সে আন্দোলনের রেষ এসে লাগে। তাতে ফুঁসে ওঠে প্রতিটি বাঙালি। মাতৃভাষার জন্য সদ্য কৈশোর পার হওয়া ছেলেটিও রাগে গজগজ করতে থাকেন শাসকগোষ্ঠীর প্রতি। ভাই হত্যার প্রতিবাদে অনেকের সাথে গর্জে ওঠে তার কণ্ঠও, মিছিলে মিছিলে তিনিও শরিক হন বিক্ষোভের পদযাত্রায়।

১৯৫৩ সালে তিনি পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের ছাত্র। সেখানেই যোগ দেন রাজনীতিতে। মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে শামিল হন বেশ জোরেশোরেই। সে বছরই পাবনার তৎকালীন জিন্নাহ পার্কে (বর্তমান স্টেডিয়াম) মুসলিম লিগ কাউন্সিল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে যোগদানের জন্য আসেন তৎকালীন পূর্ববাংলার মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন, পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী সর্দার আব্দুর রব নিশতারসহ আরও অনেক মুসলিম লিগ নেতা। ভাষা আন্দোলনে ছাত্র হত্যাকারী নুরুল আমিনের পাবনা আগমন ও মুসলিম লিগের সম্মেলনের প্রতিবাদে বিক্ষোভ করায় কামাল লোহানী পাবনার রাজনৈতিক নেতাকর্মী এবং এডওয়ার্ড কলেজের অধ্যাপক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রথমবারের মতো গ্রেপ্তার হন। এক সপ্তাহ পাবনা জেলে আটক থেকে জামিনে মুক্তি পান।

১৯৫৪ সালে পূর্ববাংলার প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের পক্ষে সক্রিয়ভাবে কাজ করেন কামাল লোহানী। সাথে প্রগতিশীল সংগঠনগুলোও। সে বছর ২১শে ফেব্রুয়ারি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আয়োজিত হয় ব্যাপক বিক্ষোভ, সেখানে অংশগ্রহণ করায় ২২শে ফেব্রুয়ারিতে আবারও গ্রেপ্তার হন তিনি। যুক্তফ্রন্ট সে নির্বাচনে জয়ী হয়। মুক্তি পান তিনি। কিন্তু পশ্চিমের শাসকেরা নির্বাচন মেনে নেয় না, তার পরিবর্তে পূর্ব পাকিস্তানে চালু করে গভর্নর-চালিত শাসনব্যবস্থা। মেজর জেনারেল ইসকান্দার মির্জা গভর্নর হয়ে এসে শুরু করেন ব্যাপক ধরপাকড়। কলেজ বন্ধ থাকায় গ্রামে চলে যান কামাল লোহানী। সেখান থেকেই তাকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়। মুক্তি পান ১৯৫৫ সালের জুলাই মাসে।

সেবার জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর পরিবারের সাথে মতবিরোধ তৈরি হয় কামাল লোহানীর। রাজনীতি করতে বাধা দেয়া হয় তাকে। পড়াশোনা শেষ করে রাজনীতি করতে বলা হয়। কিন্তু তিনি ততদিনে মানুষের অধিকার আদায়ে রাজনীতিকে পথ হিসেবে বেছে নিয়েছেন। ফলে পরিবারের ওপর অভিমান করে ঘরছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে ফেলেছেন ততদিনে। সেখানেই প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার ইতি ঘটিয়ে তার ছোট চাচা তাসাদ্দুক লোহানীর কাছ থেকে মাত্র ১৫টাকা নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। শুরু হয় তার নতুন জীবন-সংগ্রাম।

ঢাকায় এসে চাচাতো ভাই ফজলে লোহানীর সহায়তায় শুরু করেন সাংবাদিকতা। দৈনিক মিল্লাত পত্রিকার সহসম্পাদক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। বেতন ছিলো ৮০টাকা। ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন সাংবাদিকতার বড় নাম। তার তেজী কলম থেকে বের হতে থাকে অনেক জ্বালাময়ী সব সংবাদ আর প্রতিবেদন। সে বছরই যোগ দেন মওলানা ভাসানীর ন্যাপ-এ। সক্রিয় হন জাতীয় রাজনীতিতে। সাংবাদিকতা আর রাজনীতি চলতে থাকে হাত ধরাধরি করে। কিন্তু ছন্দপতন ঘটে ১৯৫৮ সালে। সামরিক অভ্যুত্থানে বিপর্যস্ত দেশে আত্মগোপনে চলে যান তিনি।

কিছুদিন পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে আবার কাগজে যোগ দেন। সেইসাথে জড়িয়ে পড়েন সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সাথে। নৃত্যের প্রতি ব্যাপক আগ্রহ ছিল। সে সূত্রে বুলবুল ললিতকলা অ্যাকাডেমিতে জি এ মান্নান যখন ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ প্রযোজনা করলেন, তখন ছেলে চরিত্রে অংশ নিলেন কামাল লোহানী। ১৯৫৯ সালে এই নৃত্যনাট্য নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশও সফর করেন তিনি। ১৯৬১ সালে পাকিস্তান সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে যান এবং ইরান ও ইরাক সফর করেন।

১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ উদযাপনের সাথে যুক্ত হন। অভিনয়, নাচ, উপস্থাপনাসহ বিভিন্ন সেক্টরে কাজ করতে থাকেন, বিভিন্ন প্রগতিশীল সংগঠনের সাথে যুক্ত হয়ে সাংস্কৃতিক আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন পুরোপুরিভাবেই। কিন্তু ১৯৬২ সালে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে কামাল লোহানীর বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি হয়। ঐ বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে ‘দৈনিক আজাদ’ থেকে ঘরে ফেরার পথে গ্রেপ্তার হন তিনি। সে সময় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ২৬ নম্বর সেলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ, আবুল মনসুর আহমেদ, রণেশ দাশগুপ্ত, তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, কফিলউদ্দিন চৌধুরী, অধ্যাপক রফিকুল ইসলামসহ অনেকেই একসঙ্গে ছিলেন। আরও ছিলেন ছাত্রনেতা শাহ মোয়াজ্জেম, শেখ মনি, হায়দার আকবর খান রনো, শ্রমিক নেতা নাসিম আলীরাও। তাদের সান্নিধ্যে সময় কাটিয়ে অনেক কিছুই শিখেন কামাল লোহানী। প্রায় সাড়ে তিন মাস পরে তিনি মুক্তি লাভ করেন।

১৯৬২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কামাল লোহানী দৈনিক ‘সংবাদ’-এ সিনিয়র সাব-এডিটর হিসেবে যোগ দিয়ে অল্প দিনেই শিফট ইনচার্জ পদে উন্নীত হন। ১৯৬৬ সালে ‘পাকিস্তান ফিচার সিন্ডিকেটে’ এবং ১৯৬৯-এর প্রথম দিকে কিছুদিনের জন্য ‘দৈনিক পয়গাম’-এ যোগ দেন। ১৯৬৯ সালের শেষে তিনি অবজারভার গ্রুপ অব পাবলিকেশন্সের ‘দৈনিক পূর্বদেশ’ পত্রিকায় শিফট ইনচার্জ হিসেবে যোগ দেন। পরে সেখানে চিফ সাব-এডিটর পদে উন্নীত হন। সে সময় তিনি সাংবাদিক ইউনিয়নে দু'দফায় যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদকও নির্বাচিত হন।

১৯৬২ সালে কারামুক্তির পর কামাল লোহানী সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেন। সাড়ে চার বছর এই দায়িত্ব পালন করে নীতিগত কারণে ছায়ানট ছেড়ে মার্কসবাদী আদর্শে ১৯৬৭ সালে গড়ে তোলেন আরেকটি সংগঠন, যার নাম ‘ক্রান্তি’। ১৯৬৭ সালের ২২ ও ২৩ ফেব্রুয়ারি ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠীর উদ্বোধন হয় ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে। সেখানে আয়োজন করেন গণসংগীতের অনুষ্ঠান ‘ধানের গুচ্ছে রক্ত জমেছে’। নাটক ‘আলোর পথযাত্রী’ পরিচালনা ও এতে অভিনয়ও করেন তিনি। শিল্পী আমানুল হক পরিচালিত নৃত্যনাট্য ‘জ্বলছে আগুন ক্ষেতে ও খামারে’তে বিবেকের ভূমিকায় নেচেছিলেন কামাল লোহানী। এই সময় তিনি আবৃত্তিতেও যুক্ত করেন নিজেকে।

উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও সত্তরের নির্বাচন-পূর্ববর্তী উত্তাল সময়গুলোতে কামাল লোহানী সাংবাদিকতা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মাধ্যমে রাখেন ব্যাপক ভূমিকা। ফয়েজ আহমেদ সম্পাদিত 'স্বরাজ' পত্রিকায় অগ্নিগর্ভ সব প্রতিবেদন লিখেন তিনি। সত্তরের নির্বাচনে বিপুল ব্যবধানে আওয়ামীলীগ জয়ী হলেও পাকিস্তানি শাসকেরা ক্ষমতা হস্তান্তর না করে একাত্তরের পঁচিশে মার্চ শুরু করে গণহত্যা।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য ভারতে চলে যান কামাল লোহানী। প্রথমে আগরতলা এবং পরে কলকাতা চলে যান। সেখানে গিয়ে দায়িত্ব নেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের। সংবাদ বিভাগের প্রধান হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে রাখেন অসামান্য ভূমিকা। ১৬ই ডিসেম্বর বিজয়ের ঘোষণা দিয়ে চলে আসেন দেশে। ২৫শে ডিসেম্বর ১৯৭১-এ দায়িত্ব নেন ঢাকা বেতারের। বিধ্বস্ত বেতার পুনর্গঠিত করেন তিনিই। সে সময় মুজিবনগর সরকার দেশে ফিরে আসার ধারাবিবরণী দেন তিনি। শুধু তাই নয়, ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ধারাবিবরণী ও পরে বঙ্গবন্ধুর কলকাতা সফরের ধারাবিবরণীও দেন দমদম এয়ারপোর্টে।

১৯৭৩ সালে বেতার ছেড়ে আবারও সাংবাদিকতায় ফিরে যান কামাল লোহানী। যোগ দেন ‘দৈনিক জনপদ’ নামে একটি নতুন পত্রিকায়। সে বছরই তিনি ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭৪ সালে ‘দৈনিক জনপদ’ ছেড়ে ‘দৈনিক বঙ্গবার্তা’য় যোগ দেন। মওলানা ভাসানী সমর্থিত এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন ফয়েজ আহমেদ। প্রায় তিন মাস পর পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ হয়ে গেলে তিনি ‘দৈনিক বাংলার বাণী’ পত্রিকার বার্তা সম্পাদক নিযুক্ত হন।

১৯৭৫ সালের ১৫ই অগাস্টের সেই ট্রাজেডির পর কামাল লোহানী সাংস্কৃতিক আন্দোলনে আবারও জড়িয়ে পড়েন। ১৯৭৭ সালে ৬ জানুয়ারি সরকার তাকে রাজশাহী থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক বার্তা’র নির্বাহী সম্পাদক নিযুক্ত করে। তিনি ঢাকা ছেড়ে রাজশাহী চলে যেতে বাধ্য হন। ১৯৭৮ সালে তাকে সেই পত্রিকার সম্পাদক পদে নিয়োগ দেয়া হয়। ১৯৮১ সালে তথ্যমন্ত্রীর সাথে মতবিরোধ হলে ‘দৈনিক বার্তা’ ছেড়ে বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের প্রকাশনা পরিচালক ও ‘ডেপথনিউজ বাংলাদেশ’-এর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ক’মাস পরেই তিনি পিআইবির এসোসিয়েট এডিটর পদে নিযুক্ত হন।

১৯৯১ সালে কামাল লোহানীকে প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে শিল্পকলা অ্যাকাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। কিন্তু মাত্র ১৬মাসের মাথায় সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রীর সাথে মতবিরোধ হওয়ায় তিনি পিআইবিতে ফিরে আসেন। পিআইবির মহাপরিচালক তাকে জোরপূর্বক অবসরে পাঠান। এবং সর্বশেষ ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে মহাজোটের বিজয়ের পর আবারো দুবছরের জন্য শিল্পকলা অ্যাকাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্ব পান।

কামাল লোহানী বাহাত্তরের সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠা জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি একুশের চেতনা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক, স্বাধীন বাংলা বেতার পরিষদের উপদেষ্টা, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটেরও উপদেষ্ট ছিলেন। ১৯৮৩ সালে তিনি সরাসরি বাংলাদেশ গণশিল্পী সংস্থা গঠন করেন এবং গণশিল্পী সংস্থার সভাপতি হন। পাশাপাশি তিনি ‘আমার বাংলা’ নামে শিল্প-সংস্কৃতি গবেষণা ও অনুশীলন চক্র গঠন করেন। দেশের বৃহত্তম প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘বাংলাদেশ উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী’র সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন একনাগাড়ে চার বছর। এরপর ‘ব্রতচারী বাংলাদেশ’ এবং ‘নব নাট্য সংঘ’র সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।

সাংবাদিকতা ও সংস্কৃতির নানা বিষয় নিয়ে কামাল লোহানী অনেকগুলো বই লিখেছেন। তার প্রকাশিত বইগুলো হচ্ছে, ‘আমাদের সংস্কৃতি ও সংগ্রাম’, ‘আমরা হারবো না’, ‘সত্যি কথা বলতে কি’, ‘লড়াইয়ের গান’, ‘সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও নৃত্যশিল্পের বিস্তার’, ‘মুক্তিযুদ্ধ আমার অহংকার’, ‘এদেশ আমার গর্ব’, ‘মুক্তিসংগ্রামে স্বাধীন বাংলা বেতার’, ‘যেন ভুলে না যাই’, ‘রাজনীতি মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীন বাংলা বেতার’, ‘দ্রোহে প্রেমে কবিতার মত’ এবং কবিতার বই ‘শব্দের বিদ্রোহ’। এছাড়াও তার ঘটনাবহুল সাংবাদিক জীবন সম্পর্কে নিজের কথা লেখ্যরূপে প্রেস ইন্সটিটিউট অফ বাংলাদেশ প্রকাশ করেছে ‘অগ্রজের সঙ্গে একদিন’ নামের গ্রন্থ। অপ্রকাশিত কিছু বইও আছে তার, যেগুলো তার আকস্মিক এই মৃত্যুর কারণে থেমে না গেলেই হয়!

কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ জীবনে নানা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন কামাল লোহানী। তারমধ্যে ২০১৫ সালে পাওয়া একুশে পদক অবশ্যই জীবনের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার হয়ে থাকবে। যদিও তার অসাধারণ সব কর্ম কোনো পুরস্কারে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়!

৮৭ বছর বয়সে মহামারি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ২০জুন ২০২০ সালে মারা যাওয়া কামাল লোহানীর জন্ম ১৯৩৪ সালের ২৬শে জুন যমুনাপাড়ের খাস কাউলিয়ায়। সর্বনাশা যমুনার ভাঙনে তাদের বাড়িঘর হারিয়ে যাওয়ায় তারা সিরাজগঞ্জেরই উল্লাপাড়া থানার খান সনতলা গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। কামাল লোহানী নামে সর্বত্র পরিচিত হলেও তার পুরো নাম আবু নঈম মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল খান লোহানী। বাবা আবু ইউসুফ মোহাম্মদ মুসা খান লোহানী। মা রোকেয়া খান লোহানী।

শৈশবে মাত্র ৬/৭ বছর বয়সেই মাতৃহারা হন তিনি। একান্নবর্তী পরিবারে বাস হওয়ায় বাবা তাকে গ্রামে না রেখে পাঠিয়ে দেন তার নিঃসন্তান ফুফু সালেমা খানমের কাছে, শহর কলকাতায়। সেখানে তিনি বেড়ে উঠতে লাগলেন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের এক বিভীষিকাময় দুর্যোগের মধ্যে। কিন্তু দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালে পাবনায় চলে আসেন। পাবনা জিলা স্কুলে ভর্তি হয়ে যান। ছোটকাকা শিক্ষাবিদ ও লেখক তাসাদ্দুক হোসেন খান লোহানীর কাছে থেকে পড়াশোনা করতে থাকেন। সেখান থেকেই একদিন চলে যান ঢাকায়।

কামাল লোহানী ১৯৬০ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী এবং আন্দোলনের সাথী তারই চাচাতো বোন সৈয়দা দীপ্তি লোহানীর সাথে গাটছড়া বাঁধেন। দীপ্তি তখন সমাজল্যাণে মাস্টার্স করছিলেন। তাদের ঘরে জন্ম নেয় তিন সন্তান। প্রথম সন্তান ছেলে, নাম সাগর লোহানী, এরপর মেয়ে বন্যা লোহানী ও ছোট মেয়ে উর্মি লোহানী। ২০০৭ সালে স্ত্রী দীপ্তি লোহানী মারা যান।

কামাল লোহানী শুধু এদেশের সাংবাদিকতা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্বই ছিলেন না; ছিলেন একটি প্রতিষ্ঠান। বাঙালির সকল আন্দোলন-সংগ্রামের একজন জীবন্ত ইতিহাস ছিলেন তিনি। কিংবদন্তি এই ব্যক্তিত্বের প্রয়াণে বাংলাদেশ তাই হারাল এক বিরল সম্পদকে।

আপাদমস্তক বাঙালি এই তেজী পুরুষ জীবনে আপস করেননি নিজের আদর্শের সাথে। নিজেকে কখনো সাহেব না ভেবে বাঙালিই ভেবেছেন সবসময়। তিনি কতটা বাঙালি ছিলেন একটা ঘটনা থেকেই ধারণা করা যায়। ১৯৭৯ সালে সম্পাদক হিসেবে রাষ্ট্রপতির এনট্যুরেজের সদস্য হয়ে লুসাকা কমনওয়েলথ হেড অফ দি স্টেট কনফারেন্সে যাওয়ার কথা ছিল তার। মিলিটারি সেক্রেটারি তাকে পাঞ্জাবি-পায়জামা ছেড়ে স্যুট-প্যান্ট পরার জন্য বলেন। কিন্তু তিনি অস্বীকৃতি জানান। নিজের পোশাক বিসর্জন দিয়ে ঐ সফরে যেতে চাননি, যানওনি। এমনকি পরে যাতে কেউ অনুরোধ করতে না পারে, সেজন্য খুলে রেখেছিলেন বাসার টেলিফোন লাইনও। এমন বাঙালিয়ানা আজকাল দেখাই যায় না!

কামাল লোহানীর মৃত্যুতে বাঙালির, দেশের অপূরণীয় ক্ষতি হলেও তিনি চিরদিন বেঁচে থাকবেন আমাদের চেতনার বাতিঘর হয়ে। তার দেখানো পথে হয়তো একদিন আমরা খুঁজে নেব আমাদের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির পথ।

এইচকে/ আই নিউজ

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়