ঢাকা, শনিবার   ১৫ আগস্ট ২০২০,   শ্রাবণ ৩০ ১৪২৭

আশরাফুজ্জামান আশিক

প্রকাশিত: ২২:৩৬, ৮ জুন ২০২০
আপডেট: ০১:৪২, ৯ জুন ২০২০

পুলিশের চোখের জলে উন্মোচন হল জোড়া খুনের রহস্য


এই পৃথিবীতে থেকে করোনা একদিন বিদায় হবে, ধরণীতে আবার নেমে আসবে সুদিন। পৃথিবী আবার হয়ে উঠবে কর্মচঞ্চল, এটাই আমাদের প্রত্যাশা সৃষ্টিকর্তার কাছে। শ্রীমঙ্গলের আশিদ্রোন ইউনিয়নের পূর্ব জামসী গ্রামের জায়েদা বেগম (৫৫) ও মেয়ে ইয়াসমিন আক্তার (৩০), মা মেয়ে ঠিক তেমনি একটি সুন্দর সকালের প্রত্যাশা নিয়ে ঘুমিয়ে ছিল সেদিন আকাশে ছিল ঝড় বৃষ্টি টিনের চালে বৃষ্টির ঝুমঝুম শব্দ, ঘুমটাও ছিল গভীর।কে জানতো এই ঘুম তাদের জীবনের শেষ ঘুম, আর কখনোই ভাঙবে না সেই ঘুম।

আশিদ্রোন ইউনিয়নের পূর্ব জামসী গ্রামের ইয়াসমিন আক্তার এর সাথে আজ থেকে পনের বছর আগে পার্শ্ববর্তী সিন্দুরখান ইউনিয়নের বেলতলী গ্রামের আজগর মিয়ার বিবাহ হয়। তাদের কোলজুড়ে আসে দুটি সন্তান। সুখেই চলছিল দু সন্তান নিয়ে তাদের সংসার। হঠাৎই একটি দূর্ঘটনায় স্বামী গাছ কাটার শ্রমিক আজগর আলী পা ভেঙে কয়েক মাস শয্যাশায়ী ছিল। এই সময় পার্শ্ববর্তী জনৈক ব্যাক্তির সাথে ইয়াসমিন আক্তার এর ঘনিষ্ঠতা হয় বলে জানা যায়। এই বিষয়গুলো নিয়ে প্রায় সময় তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি ও ঝগড়া হয়।

আনুমানিক প্রায় ১৫ মাস পূর্বে স্বামী স্ত্রীর ঝগড়ার জের ধরে, ইয়াসমিন তার মায়ের সাথে মায়ের বাড়িতে চলে যায়। তারপর থেকে সেখানেই অবস্থান করে আসছিল। সন্তান দুটি ছিল বাপের কাছে, তারপর আত্মীয়-স্বজন পাড়া-প্রতিবেশী স্থানীয় চেয়ারম্যান মেম্বার অনেক বিচার-সালিশ হয় কিন্তু ইয়াসমিন আর স্বামীর বাড়িতে ফিরে যায় নাই। দুটি সন্তান নিয়ে আজগর তার দাদির সাথে বসবাস করে। ইয়াসমিন আসতে রাজি না হওয়ায় আজগরের মনে বিশ্বাস জন্মায় ইয়াসমিনের মা তার মেয়েকে স্বামীর বাড়ি না যেতে প্রলুব্ধ করছে। প্রতিহিংসাপরায়ণ আজগর তাদেরকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার জন্য ছক আঁকতে থাকে। ঘটনার এক সপ্তাহ পূর্বে ও ওই এলাকায় ঘোরাফেরা করতে দেখা গেছে আজগর কে।

চার জুন রাতের বেলা খাওয়া-দাওয়া করে দুই সন্তানকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে আজগর। সন্তানরা ঘুমিয়ে পড়লে ধীরে ধীরে ঘুম থেকে উঠে বাইসাইকেল নিয়ে রওনা হয় ইয়াসমিনের বাড়ির উদ্দেশ্যে পাকা রাস্তা টুকু সাইকেল চালিয়ে বাকি রাস্তাটুকু সাইকেল নিয়ে হেঁটে ইয়াসমিন দের বাড়ির সামনে সাইকেল রেখে পূর্ব পরিকল্পনামাফিক রান্না ঘরের পেছনের বেড়া কেটে ঘরে প্রবেশ করে আজগর।

রান্নাঘরে চুলার পাশে রাখা লোহার চুঙ্গা( মাটির চুলায় আগুন জ্বালাতে ব্যবহৃত লোহার পাইপ) নিয়ে মা-মেয়ের বিছানার পাশে পৌঁছায় হাতে থাকা লাইটারের টর্চ জ্বালিয়ে আঘাত করে ইয়াসমিনের মাকে শুধুমাত্র ওহ শব্দ করেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন ইয়াসমিনের মা। ঘুমের ঘোরে ইয়াসমিন কিছু বুঝে ওঠার আগেই গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে ইয়াসমিনের বুকে আঘাত করে চুঙ্গা দিয়ে। বাহিরে তখনও প্রচন্ড ঝড়বৃষ্টি। আর এদিকে যে আজগরের হাত ধরে লাল বেনারসি পরে একদিন বাবার বাড়ি ছেড়ে স্বামীর বাড়ি গিয়েছিল, সেই আজগরের হাতেই রক্তে লাল হলো ইয়াসমিনের দেহ, বিছানার উপর পরে রইলো ইয়াসমিনের দেহ, আর বিছানাতে আধা শোয়া অবস্থায় পড়ে আছে ইয়াসমিনের মায়ের নিথর দেহ। আজগর সুপরিকল্পিতভাবে ঠান্ডা মাথায় মা মেয়েকে হত্যা করার পর আবারো পেছনের কাটা বেড়া দিয়ে বের হয়ে নিজের বাড়িতে চলে যায়। ভাঙা বেড়ার পাশে ছড়ানো-ছিটানো কয়েকটি ইটের পাশে ফেলে যায় হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত লোহার চুঙ্গা। সাইকেল রেখে শার্ট লুঙ্গি ধুয়ে যথারীতি ঘুমিয়ে পড়ে আজগর।

একসময় থেমে গেল ঝড়বৃষ্টি চারদিকে ফুটলো ভোরের আলো, কিন্তু ইয়াসমিন এবং ইয়াসমিনের মা জায়েদা তখনও ঘুম থেকে উঠে নাই। পাশের ঘরে বসবাসকারী ইয়াসমিনের খালা কোন ডাকাডাকি করে সাড়া শব্দ না পেয়ে স্থানীয় মেম্বারকে খবর দেয়, মেম্বার এসে লোকজনকে নিয়ে ডাকাডাকি করে কোন সাড়াশব্দ না পেয়ে স্থানীয় চেয়ারম্যানকে খবর দেয়, চেয়ারম্যান এলাকার লোকজন নিয়ে এসে দরজা খুলে দেখতে পায় ইয়াসমিনের মা জায়েদা বেগম এর মৃতদেহ , ইয়াসমিন মৃতদেহ তখনো কারো চোখে পড়েনি মশারির ভেতরে প্যাঁচানো ছিল ইয়াসমিনের মৃতদেহ।

ঘটনার সংবাদ পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মশারির ভেতর ইয়াসমিনের মৃতদেহ শনাক্ত করে। মৌলভীবাজার জেলার পুলিশ সুপার জনাব ফারুক আহমেদ পিপিএম বার  ,অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জনাব মোঃ আনোয়ারুল হক সহ জেলা পুলিশের একটি বিশেষ টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছায়, এর পাশাপাশি সিআইডি ও পিবিআইর টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছে। মাননীয় পুলিশ সুপার স্যার ঘটনাস্থল ও তার চারপাশ দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষণ করে আমাদেরকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন। স্যারের নির্দেশনা মোতাবেক শুরু হয় অপরাধীকে ধরার মিশন।

ঘটনার পর থেকেই পুলিশ গোপনে তথ্য সংগ্রহ করতে থাকে এই ঘটনা কারা ঘটাতে পারে ? কাদের স্বার্থ আছে ? কোন পারিবারিক বিরোধ আছে কিনা? অপরদিকে পুলিশের আরেকটি টিম মাননীয় পুলিশ সুপার স্যারের নির্দেশে নিহত ইয়াসমিনের স্বামী আজগরের গতিবিধির উপর লক্ষ রাখতে থাকে। আজগরের গতিবিধি সন্দেহজনক হলে পুলিশ তাকে সিন্দুরখান এলাকা থেকে গ্রেফতার করে। মাননীয় পুলিশ সুপার স্যারের সার্বিক নির্দেশনায় শুরু হয় নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ, জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে আজগর তার স্ত্রী ইয়াসমিন ও শাশুড়ি কে হত্যার দায় স্বীকার করে হত্যার বর্ণনা দেয়। তার স্বীকারোক্তি মোতাবেক ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয় হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত চুঙ্গা। আজগর কে বিজ্ঞ আদালতে প্রেরণ করলে সে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে।

টানা দুই দিনের বিরতিহীন প্রচেষ্টার ফলে উদ্ঘাটিত হয় ইয়াসমিন ও জায়েদা আক্তারের হত্যার রহস্য। কিন্তু পেছনে পড়ে থাকে ইয়াসমিন ও আজগর দম্পত্তির দুটি নিষ্পাপ শিশুর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। শিশু দুটির মূখের দিকে তাকিয়ে মনের অজান্তেই চোখের কোনে জমে ছিল দু'ফোটা জল।

লেখক: সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (শ্রীমঙ্গল সার্কেল) মৌলভীবাজার।

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়