ঢাকা, শুক্রবার   ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১,   আশ্বিন ২ ১৪২৮

তানজিয়া সালমা

প্রকাশিত: ১৬:৩২, ১৮ জুন ২০২০
আপডেট: ১৭:১৯, ১৮ জুন ২০২০

গরীবের ডাক্তারকে পিটিয়ে মেরে ফেললাম আমরা!

একজন ডাক্তার, যিনি এই গভীরতর সংকটকালে নিজের জীবনকে বাজী রেখে নিয়মিত ক্লিনিকে গিয়েছেন, মানুষকে সেবা দিয়েছেন অকাতরে। তিনি ডাক্তার, যিনি কত মানুষকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিছে এনেছেন বহুবার।
তারই জীবন আমরা কেড়ে নিলাম কী নিষ্ঠুরতম পন্থায়।

যারা ডাক্তারদের চৌদ্দগোষ্ঠি উদ্ধার না করে অন্ন গ্রহণ করেন না। তাদেরকে বলবো ঢাকা মেডিকেলে যান। তিনদিন সেখানকার পরিবেশ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে আসেন। দেখে আসেন কী অপরিসীম সীমাবদ্ধতার মাঝেও ডাক্তারদের আন্তরিক প্রচেষ্টা। একজন ডাক্তার ইচ্ছাকৃতভাবে কোন রোগীকে মেরে ফেলেছেন এই ধারণা যারা পোষণ করেন, আমি দুঃখের সাথে বলছি-তাদের চিন্তার সুস্থতা নিয়ে আমি সন্দিহান। কী লাভ তার কাউকে মেরে ফেলে! হ্যা ভুল হতে পারে। সেটা মানুষ মাত্রেই হতে পারে। আপনার আমার ভুল হয়না? সে ভুলের মাশুল তো তার জীবন নিয়ে নেওয়া নয় বা মারধোর করা নয়।

বলা হচ্ছে তিনি ভুল চিকিৎসা দিয়েছেন। এটা কে নির্ধারণ করল? আপনি কেমন করে জানেন যে তিনি ভুল করেছিলেন? আপনি কি ডাক্তার যে তার দেওয়া ডাক্তারী নিদানকে আপনার সাধারণ জ্ঞানে বলে দিবেন- চিকিৎসাটি ভুল ছিল। কষ্ট হয়, ভীষণ কষ্ট হয়। তারচেয়েও বেশি রাগ হয়। একজন ডাক্তারকে এভাবে মেরে ফেলা যায়! এত সহজে! এত অবলীলায়!

জাতির মেধাবী সন্তানেরাই এ দেশে ডাক্তার হয়। নিরলস পরিশ্রম, অধ্যবসায়, নিয়মিত পড়াশুনা, অনেক ত্যাগ স্বীকার করেই একটি ছেলে বা মেয়ে ডাক্তার হয়। যে কোন ছাত্রের চেয়ে তাদেরকে অনেক বেশিই পড়তে হয়। একজন ডা. রকিব একদিনে তৈরী হয়না। অথচ এক নিমিষে তার জীবন নিয়ে নেওয়া কত সহজ এ দেশে!

দু-চোখে জল আর বুকের মাঝে ব্যথার দ্রোহ নিয়ে আপনার কাছে করজোড়ে ক্ষমা প্রার্থণা করছি। আমরা তো আপনার মূল্যায়ন করতে পারলাম না, অন্য ভুবনের মালিক নিশ্চয় আপনাকে সম্মানিত করবেন। যেখানেই থাকুন অনেক ভালো থাকবেন। আপনি হয়ত আপনার হত্যাকারীদেরকে ক্ষমা করবেন মহৎপ্রাণ হিসেবে। আমরা যেন না করি।

একজন ডাক্তারকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। সেটা নিয়ে আমার বেদনামিশ্রিত ক্ষোভটুকু ফেসবুকে শেয়ার করেছিলাম। সেখানে কিছু মানুষের(?) এর কমেন্ট আমাকে এ লেখাটা লিখতে বাধ্য করল। কেউ বলেছে- ডাক্তার টাকার পিছে ছোটে, কেউ বলেছে নেশা করে, কেউ বলেছে সেবা দেয়না। অতএব তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলাটা জায়েজ হয়ে গেল! এটা তার প্রাপ্য ছিল!
 

কী ভয়ঙ্কর অসুস্থ ভাবনা! আমি বলছি না ডাক্তারী পেশায় মন্দ মানুষ নেই। কোন পেশায় মন্দ মানুষ নেই সেটা বলেন আমাকে। তাই বলে তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলতে হবে এ কেমন আচরণ!

কোন এক কোরবানির ঈদের পরে আমার এক সহকর্মীর স্বামী মোটর সাইকেল এক্সিডেন্ট করে। তাকে ঢাকা মেডিকেলে নেওয়া হয়। ঈদে বেশিরভাগ মানুষ দেশে চলে যায়। সহকর্মী আমাকে ফোন করে সাহায্য চায়। আমার বাসা তখন আজিমপুর সরকারী কোয়ার্টারে। আমি ঢাকা মেডিকেলে গিয়ে সেদিন এবং তার পরবর্তী কয়েকদিন যা দেখেছিলাম তাতে কিছু নবীন এবং প্রবীণ ডাক্তারকে মনে মনে হাজার বার সালাম ঠুকেছি। কী ভীষণ সীমাবদ্ধতার মধ্যে তাদের কাজ করতে হয় সেটা আমি খুব কাছে থেকে দেখেছি। তারপরেও ডাক্তারগণ তাদের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করেছিলেন। তাদের ঈদের আনন্দ নেই। ঈদের সময়ে দুর্ঘটনা বেশি ঘটে বলে একটার পর একটা এমন রোগী আসতে দেখেছি আমি মাত্র কয়েক ঘন্টায়। আর ডাক্তারদের ছোটাছুটি দেখেছি তাদের সুস্থ করে তুলতে।

আমার সহকর্মীর স্বামীকে আইসিইউতে রাখা হয়েছিল। আমাকে এবং আমার সহকর্মীকে সেখানে যাবার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। সেটা আমার প্রথম কোন আইসিইউ দেখার অভিজ্ঞতা। যে কোন প্রয়োজনীয় জিনিসের অপ্রতুলতা ডাক্তারসহ সেবাকর্মীদের বাধ্য করছে জোড়াতালি দিয়ে কাজ চালাতে। তবুও তারা চেষ্টা করে চলেছে রোগীকে সুস্থ করতে। এই যে সঠিক পরিবেশ না পাওয়া, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম না থাকা এসবের জন্য তো ডাক্তার দায়ী নয়। তিনি তার মেধা ও যোগ্যতা বলে ডাক্তার হয়েছেন। তার কাজ করার পরিবেশ দেওয়ার দায়িত্ব যাদের তাদের কাজটুকু তারা কতটা করেছে সেটা দেখবার বিষয়।

যারা ডাক্তারদের চৌদ্দগোষ্ঠি উদ্ধার না করে অন্ন গ্রহণ করেন না। তাদেরকে বলবো ঢাকা মেডিকেলে যান। তিনদিন সেখানকার পরিবেশ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে আসেন। দেখে আসেন কী অপরিসীম সীমাবদ্ধতার মাঝেও ডাক্তারদের আন্তরিক প্রচেষ্টা। একজন ডাক্তার ইচ্ছাকৃতভাবে কোন রোগীকে মেরে ফেলেছেন এই ধারণা যারা পোষণ করেন, আমি দুঃখের সাথে বলছি-তাদের চিন্তার সুস্থতা নিয়ে আমি সন্দিহান। কী লাভ তার কাউকে মেরে ফেলে! হ্যা ভুল হতে পারে। সেটা মানুষ মাত্রেই হতে পারে। আপনার আমার ভুল হয়না? সে ভুলের মাশুল তো তার জীবন নিয়ে নেওয়া নয় বা মারধোর করা নয়।

আমি মানছি সব পেশায়ই মন্দ লোক আছে। তার সংখ্যাও নিতান্ত কম নয়। কিন্তু তাই বলে কোন কিছু ঘটলেই মানুষ হিসেবে আমি হত্যাকারির ভূমিকায় নেমে যাব! এ কেমন চিন্তা! যদি সত্যিই কেউ অন্যায় করে থাকে তার প্রতি উত্তরে আর একটা অন্যায়ের জন্ম দেওয়া কোন মতেই সমর্থনযোগ্য হতে পারেনা।

আমার এ লেখা কোন একটি গোষ্ঠী বা শ্রেণির জন্য নয়। এ লেখা আমাদের মত সাধারণ মানুষের জন্য। আমরা কি ভেবে দেখব আসলে মানুষ পরিচয় দেবার মত মানবিক বোধ আমার মাঝে আছে কিনা।

পরিবারে মেধাবী বাচ্চা থাকলেই তাকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বানাতে চাই আমরা। কজন বাবা-মা তার সন্তানকে সত্যিকার মানুষ হবার দীক্ষা দিচ্ছি। আমি সচেতনভাবেই দীক্ষা শব্দটি বলেছি। শিক্ষা দিয়ে মানুষকে ডাক্তার ইঙ্জনিয়ার বানানো যায়। মানুষ বানাতে হলে দীক্ষা দিতে হয়। পিতামাতা, শিক্ষককে গুরুর ভূমিকা নিতে হয়। আপনি আচারী ধর্ম পরকে শিখাতে হয়। সেই ভূমিকায় আমার দায়িত্ব কতটুকু পালন করেছি?

-লেখকের ফেসবুক থেকে নেওয়া

Green Tea
সোশ্যাল মিডিয়া বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
সর্বশেষ
জনপ্রিয়