ঢাকা, শুক্রবার   ১৮ জুন ২০২১,   আষাঢ় ৪ ১৪২৮

ডা. আফরিন সুলতানা

প্রকাশিত: ২১:০৩, ২১ মে ২০২১
আপডেট: ১০:১০, ২২ মে ২০২১

চিকিৎসায় সার্জারি মানেই কী গাউন পরা পুরুষ?

ডা. আফরিন সুলতানা

ডা. আফরিন সুলতানা

'নিজের মেধার উপর ভরসা রাখতে হবে ও নিজের ন্যায্য অধিকারের জন্য লড়াই করার মনোভাব থাকতে হবে। তোমার আত্মবিশ্বাস ও দক্ষতাই যেন তোমার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হয়। তাহলে যতই বাঁধা আসুক, তুমি ঠিকই বিজয়ী হবে।'

সার্জন বলতেই আমাদের চোখে যে ছবিটা ভেসে ওঠে তা হলো একজন পুরুষ ওটি গাউন পরে দাঁড়িয়ে আছে আর আমাদের সবার মধ্যেই এরকম একটা পূর্বধারণা কাজ করে। এটা সত্য যে সার্জারিতে পুরুষদের আধিপত্য আছে। এই আধিপত্যের কারণেই হোক বা পারিবারিক চাপের কারণেই হোক, একজন মেয়েকে সার্জারি বেছে নিতে খুব কম সময়ই উৎসাহিত করা হয়। যদিওবা সে সার্জারি বেছে নেয়, তাকে চলার পথে অনেক বাঁধা ও সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়।

আমি নিজে যেহেতু একজন সার্জন, এই ব্যাপারে আমার অনেক অম্লমধুর অভিজ্ঞতা আছে। তোমার যারা পুরুষ সহকর্মী থাকে তারা তোমার প্রতি একটা নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করে যেন এটা তোমার জায়গা না বা ভুল করে এখানে চলে এসেছো। আমি যখন হেড সার্জন হিসেবে সার্জারি করি, আমি খেয়াল করেছি তারা এটাতে কিছুটা অস্বস্তি বোধ করে। একজন নারীর নেতৃত্বে অপারেশন করতে হবে- এই ব্যাপারটাতে তারা অভ্যস্ত না এবং হয়তোবা চায়ও না। এই অহংবোধ কখনোই সম্পূর্ণভাবে ত্যাগ করা যায় না। তোমার যদি তাদের সমান মেধাও থাকে, কখনো বা বেশিও, তারপরেও তোমার প্রাপ্যটুকু তারা স্বীকার করতে চাবেনা।

আমাদের যে শিক্ষাব্যবস্থা, তাতে সার্জন হওয়া বেশ কঠিন, সেটা তুমি পুরুষ হও কি নারী। ফেলোশিপ ডিগ্রি যদি করতে চাও, সেখানে যথেষ্ট অব্যবস্থাপনা আছে। ঠিকমতো সুপারভাইজ করার মত কাউকে সেখানে পাওয়া যায়না। আমাদের পেশায় সবারই একজন মেন্টর প্রয়োজন হয়, সেটা তুমি যেই ডিসিপ্লিনেরই হও না কেন। আমাদের এই ব্যাপারটার অভাব আছে এবং সঠিক গাইডেন্সের অভাবের কারণেই অনেকের পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। সেই তুলনায় রেসিডেন্সী কিছুটা ভাল। রেসিডেন্সী করলে সুস্থ প্রতিযোগিতার একটা পরিবেশ পাওয়া যায়। যদিও এখানেও অনেক কিছুই বদলানোর প্রয়োজন আছে।

'আমাদের নিজেদের নেয়া সিদ্ধান্তগুলোর কারণেই আমরা পিছিয়ে যাই বা স্বপ্নপূরণের পথে এগিয়ে যাই। তাই সিদ্ধান্ত যেটা নিচ্ছি সেটা যেন সঠিকটা হয়। নিজের ইচ্ছাকে গুরুত্ব দাও, অন্যেরা কি বললো তাতে নয়, তাহলেই তুমি তাদের সবার চাইতে ভালো কিছু করে দেখাতে পারবে'

 তুমি যদি একজন মেয়ে হও, তাহলে এসবের সাথেও আরো দ্বিগুণ সমস্যা যোগ হয়। এমন একটা সময় আসবে যখন তোমাকে তোমার পরিবার আর ক্যারিয়ারের মাঝে যেকোনো একটাকে বেছে নিতে হবে। সবাই তোমার রাতের পর রাত নাইট ডিউটি মেনে নিবেনা। তাই এখানে আসতে হলে অনেক কিছু ত্যাগ করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। কিন্তু এজন্য কখনোই যাতে থেমে যেতে না হয়। নিজের মেধার উপর ভরসা রাখতে হবে ও নিজের ন্যায্য অধিকারের জন্য লড়াই করার মনোভাব থাকতে হবে। তোমার আত্মবিশ্বাস ও দক্ষতাই যেন তোমার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হয়। তাহলে যতই বাঁধা আসুক, তুমি ঠিকই বিজয়ী হবে।

সার্জন হওয়াটা একটা আশীর্বাদ। একজন মানুষ তার সবকিছু দিয়ে তার সার্জনকে বিশ্বাস করে। আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থায় বহু নারী আছেন যারা নিজেদের জন্য একজন নারী সার্জন বেশি পছন্দ করবেন কিন্তু আমাদের সংখ্যা এত কম হওয়ায় হয়ত ঠিকমতো খুঁজে পাননা। তাই আমাদের সাহস করে স্ক্যালপল হাতে তুলে নিতে এগিয়ে আসতে হবে, প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে আর নিজের স্বপ্নপূরণের পথে কোন কিছুকেই বাঁধা হতে দেয়া যাবেনা। আমাদের নিজেদের নেয়া সিদ্ধান্তগুলোর কারণেই আমরা পিছিয়ে যাই বা স্বপ্নপূরণের পথে এগিয়ে যাই। তাই সিদ্ধান্ত যেটা নিচ্ছি সেটা যেন সঠিকটা হয়। নিজের ইচ্ছাকে গুরুত্ব দাও, অন্যেরা কি বললো তাতে নয়, তাহলেই তুমি তাদের সবার চাইতে ভালো কিছু করে দেখাতে পারবে।

ডা. আফরিন সুলতানা, রেজিস্ট্রার, সার্জারি বিভাগ, হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ এন্ড হাসপাতাল।

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়