ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০৭ জুলাই ২০২২,   আষাঢ় ২৩ ১৪২৯

আলমগীর শাহরিয়ার

প্রকাশিত: ২১:৫৬, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২
আপডেট: ২৩:৩১, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২

যে স্বীকৃতি ও সম্মাননা প্রেরণার

আলমগীর শাহরিয়ার

আলমগীর শাহরিয়ার

শতবর্ষ আগে বিশ্বকবির কথার মান রাখতেই যেন কর্তৃপক্ষ শুধু প্রশংসাপত্র ধরিয়ে দেননি মাস দুয়েক আগেই অর্ধ লক্ষ টাকার সম্মানীও পাঠিয়েছেন। পোড়া দেশে পাঁচ বছর কষ্ট করে একটি গবেষণা-গ্রন্থ প্রকাশ করেও যা এখনও আশা করতে পারি না।

বহুদিন নিজের নামে কোনো চিঠি আসে না। আজ থেকে বিশ-বাইশ বছর আগে নিয়মিত আসতো। থাকতাম নানুবাড়ি (আমরা নানুকে ডাকতাম 'নানাবু' বলে)। সিলেটের বিশ্বনাথের উত্তরে নির্জন সুন্দর একটি গ্রাম নোয়াপাড়ায়। অনতিদূরেই সুরমার সহোদরা নদীর তীরে রাজাগঞ্জ বাজার।

সে বাজারটির পোস্ট অফিসে বড় খালামণি লন্ডন থেকে চিঠি পাঠাতেন। প্রযত্ন সহকারে আমার নামে। পাঠাতেন আমার প্রবাসী পিতাও। জীবিকার জন্য দূরে থাকলেও মমতার সঙ্গে সন্তানের জন্য উদ্বেগ উৎকণ্ঠাও কাজ থাকতো। পড়াশোনার খোঁজ-খবর নিতে নিয়মিত চিঠি পাঠাতেন রাজাগঞ্জ বা সুনামগঞ্জের ছাতকের চরমহল্লা বাজারে। স্কুলপড়ুয়া এক অল্পবয়সী বালকের নিজের নামে চিঠি আসতো বলে ভীষণ আনন্দ হতো। অস্তিত্বের অফিসিয়াল স্বীকৃতি যেন। 

হাঁট বারে নির্ধারিত সময়ে পোস্ট অফিসের সামনে পোস্টমাস্টার স্বজনের সংবাদের জন্য অপেক্ষমান কৌতুহলী-ভিড়ে চিঠির প্রাপকের নাম ধরে ডাকতেন। অমুক গ্রামের তমুক। উৎকর্ণ সবাই। যাদের চিঠি রেজিস্টার্ড করা থাকতো সে চিঠি নিয়ে পোস্টমাস্টার বা রানার হাজির হতেন প্রাপকের বাড়িতে। সাধারণত এ ধরণের চিঠিতে জরুরি সংবাদ বা সুখবর থাকত বলে বাহকের বাড়তি কিছু প্রাপ্তির সম্ভাবনা থাকত। বিশেষ করে রানারের জীবন ছিল ছুটে চলার। সংগ্রামের। সুকান্তের কবিতা মনে পড়ে,

“রানার! রানার!
জানা-অজানার
বোঝা আজ তার কাঁধে,
বোঝাই জাহাজ রানার চলেছে চিঠি আর সংবাদে; 
...এমনি ক’রেই জীবনের বহু বছরকে পিছু ফেলে,
পৃথিবীর বোঝা ক্ষুধিত রানার পৌঁছে দিয়েছে ‘মেলে’।
ক্লান্তশ্বাস ছুঁয়েছে আকাশ, মাটি ভিজে গেছে ঘামে
জীবনের সব রাত্রিকে ওরা কিনেছে অল্প দামে।”

সে যুগ হয়েছে বাসি বহু আগে। নতুন প্রযুক্তি স্থান নিয়েছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প 'পোস্টমাস্টার' গল্পে রতনের সঙ্গে বিদায়ী পোস্ট মাস্টারের নদী তীরে উদাস-হৃদয়ের সেই তত্ত্বের মতো, “জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া ফল কী। পৃথিবীতে কে কাহার।” নশ্বর এ-পৃথিবীতে কেউ কারো নয়। কালের গর্ভে যা হারায় তা আর ফেরে না। বস্তু, ব্যক্তি বা কাঠামো হোক, ‘প্রতিটি বিদায় তো একটি ছোট্ট মৃত্যু।’ বেশ কবছর হলো পিতা গত হয়েছেন। বড়খালাও আর চিঠি লিখেন না। প্রয়োজন পড়ে না। শুনেছি রোগ-শোকে আকীর্ণ জীবন। নানাবুও বহু আগে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। রাজাগঞ্জ বাজারের পুরনো গলির দক্ষিণ দিকের শুরুতেই স্থাপিত পাকাঘরের সেই পোস্ট অফিসটি এখনও আছে কিনা কে জানে। 

সর্বশেষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু হলের ৪১৩ নাম্বার রুমের ঠিকানায় উচ্ছ্বাসেভরা প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষে দুএকজন হৃদয়হরণী পাঠিয়েছিলেন শখের পত্র। ততদিনে মুঠোফোনের নতুন 'ভাষা' এসে গেছে, পিওন ও টেলিগ্রাম হারিয়েছে। তবু মনের খবর লিখে তাদেরই  কেউ কেউ দুএকবার পত্র লিখেছিলেন, তাদের একজন ছিল রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী। একদিন প্রিয় শহর সিলেটের এক ক্যাম্পাসে বন্ধুদের আড্ডায় শুনিয়েছিল, "পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে পাগল আমার মন জেগে ওঠে"... গানটি। শুনেছি সে-ও আমূল বদলে গেছে। সত্যি মানুষ বেঁচে থাকলে বদলায়। কারণে-অকারণে। 

ধান ভানতে যেন শিবের গীত গাইলাম। বহুদিন পর গতকাল অফিসের ঠিকানায় একটি চিঠি পেলাম। এসেছে সাত সমুদ্র তেরো নদী পাড়ি দিয়ে গল্প শুরু করা উপলক্ষ্যের দূর দেশ বিলেত থেকেই। লন্ডন থেকে আসা খামটির মধ্যে আছে একটি সুলিখিত সম্মাননা ও প্রশংসাপত্র।

একজন তরুণ লেখক হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষ্যে London Borough of Tower Hamlets-এর আয়োজনে যুক্তরাজ্য, সাইপ্রাস ও বাংলাদেশের অংশগ্রহণকারীদের নিয়ে Freedom and Independence Theater Festival 2021-এর Youth Writing Projects-এ ভার্চুয়ালি অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রিত হয়েছিলাম। কথা বলেছিলাম "Freedom and Independence: Bangladesh and Global Perspective" এই টপিকসের উপর একটি প্রবন্ধ উপস্থাপনা করে। তা ছাড়া ছিল আরও কিছু সেশন। তারই আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। আমাদের দেশে যা হয় নীলক্ষেত থেকে একটি প্রশংসাপত্র (পড়ুন কাগজ) ও একটি ক্ষয়িষ্ণু আয়ুর ক্রেস্ট ধরিয়ে দিয়ে অংশগ্রহণকারীকে ধন্য করেন আয়োজকরা। আর ঢাকার ধুরন্ধর রত্ন ও পদক ব্যবসায়ীরা তো পদাকাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকে উলটো টাকা পয়সা নিয়ে পদক বিক্রি করেন। কিন্তু বিলেতিরা কারো প্রাপ্য সম্মান ও স্বীকৃতি দিতে কসুর করে না। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন ইংরেজ দুই প্রকার- ১) বৈজ্ঞানিক, দার্শনিক, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সমঝদার; ২) উপনিবেশবাদী। বলা নিষ্প্রয়োজন, রবীন্দ্রনাথ শেষোক্ত নয়, প্রথমোক্ত ইংরেজদের প্রশংসা করেছিলেন। 

শতবর্ষ আগে বিশ্বকবির কথার মান রাখতেই যেন কর্তৃপক্ষ শুধু প্রশংসাপত্র ধরিয়ে দেননি মাস দুয়েক আগেই অর্ধ লক্ষ টাকার সম্মানীও পাঠিয়েছেন। পোড়া দেশে পাঁচ বছর কষ্ট করে একটি গবেষণা-গ্রন্থ প্রকাশ করেও যা এখনও আশা করতে পারি না। পারবই বা কেমনে এদেশে এশিয়াটিক সোসাইটি বা বাংলা একাডেমির মতো শীর্ষ প্রতিষ্ঠানও সিনিয়র গবেষকদের গবেষণা কর্মের জন্য সম্মানী দেয় তাও এই উপর্যুক্ত সম্মানীর কম। যা হোক, আমার মতো বাংলাভাষার ক্ষুদ্র একজন লেখককে এ-সম্মান জানানোয় গৌরবান্বিত বোধ করছি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও অশেষ কৃতজ্ঞতা জানাই। কিছুটা হয়তো নিজের ঢোল পেটালাম। তবু সুধীজন, অভাজনকে ভালোবাসা ও প্রার্থনায় রাখবেন। আজীবন একজন লেখকই হতে চেয়েছি। এর বাইরে কোনো স্বপ্ন দেখিনি। তাই লেখালেখি সংক্রান্ত যে কোনো প্রাপ্তি ও স্বীকৃতি বড়ো আনন্দের। সে-আনন্দই বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ করলাম।

আলমগীর শাহরিয়ার, কবি, গবেষক ও প্রাবন্ধিক

Green Tea
সোশ্যাল মিডিয়া বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
সর্বশেষ
জনপ্রিয়