ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০৭ জুলাই ২০২২,   আষাঢ় ২৩ ১৪২৯

সালেহ উদ্দিন আহমেদ

প্রকাশিত: ২৩:১৩, ১৬ জুন ২০২২
আপডেট: ০১:২৫, ১৭ জুন ২০২২

পুলিশ কর্মকর্তার ডায়েরি-১

লোমহর্ষক শিশু হত্যাকাণ্ড ও পুলিশের দায়িত্বশীল আচরণ

সালেহ উদ্দিন আহমেদ, লেখক

সালেহ উদ্দিন আহমেদ, লেখক

২০০৭ সাল। আমি সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ হিসেবে হিসাবে দায়িত্ব পালন করছিলাম। সকালে জনৈকা মহিলা মেম্বার ফোনে জানালেন নলুয়া হাওরে ঝাউবনে একটি মেয়ের মৃতদেহ পরে আছে। চিন্তা করতে লাগলাম কি হতে পারে। 

এসআই পরেশকে তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ করে দ্রুত ঘটনাস্থলে পাঠালাম। ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরেশ আমাকে মোবাইল ফোনে জানায় ১৩ থেকে ১৪ বছরের একটি মেয়ের মৃতদেহ। গণধর্ষণ এটা নিশ্চিত। যথেষ্ট আলামত ও চিহ্ন বিদ্যমান। আমি তাকে যথাযথ নির্দেশনা দিলাম।

থানায় এসে পরেশ আমাকে জানায় ‘মেয়েটি কোন ভদ্রঘরের হতে পারে। অতিশয় সুন্দরী, অনেক লম্বা চুল, কালো সেলোয়ার ও সাদায় নীল লতাপাতা কামিজ পরিহিত ছিল। মৃতদেহ অজ্ঞাতনামা হিসাবে  ময়নাতদন্তের জন্য প্রেরণ করা হয়েছে।’ 

সন্ধ্যায় পরেশ আমাকে জানায় যেহেতু গণধর্ষণ ও শ্বাসরুদ্ধ করে মৃত্যু ঘটানো হয়েছে। তাই সে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে এজাহার দায়ের করতে চায়। আমিও যা সত্য পেয়েছে তাই লিখে এজাহার দায়ের করতে বলি।

মৃতদেহ উদ্ধারের পরদিন মহিলাকে তাঁর মেয়ের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য থানায় উপস্থিত হতে সংবাদ দিলে তিনি উপস্থিত হন। মেয়ের কথা জিজ্ঞেসাবাদ করলে তিনি জানান ‘স্যার আমার মেয়ে অনেক সুন্দর, চুল পায়ের ঘন্টা পর্যন্ত। আমি এতেই নিশ্চিত হয়ে যাই।’

এ সময় যিনি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা হবেন তিনি এসআই পরেশকে বলেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে এজাহার না দিয়ে ৩০২ ধারায় একটি মামলা দায়ের করতে। ৩০২ ধারায় মামলা হলে তিনি এটি দীর্ঘদিন ছয়মাস-একবছর ধরে তদন্ত করতে পারবেন। নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলা রুজু করা হলে অবশ্যই ৬০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করে রহস্য উদঘাটন করে চার্জশিট দিতে হবে। 

তদন্তকারী কর্মকর্তা (নাম বলছি না) আমাকে বলেন স্যার আপনি বললে পরেশ বাবু এজাহার পরিবর্তন করে দিবে। একটু পরেশ বাবুকে বলেন। আমি বললাম পরেশকে বলেছি যা সত্য পেয়েছে তাই যেন এজাহারে লিখে দেয়। 

তদন্তকারী কর্মকর্তা বিষয়টি পুলিশ সুপার সিলেট মহোদয়ের দৃষ্টি গোচরে আনেন এবং পুলিশ সুপার মহোদয়কে ভুল তথ্য দিয়ে ৩০২ ধারায় মামলা রুজুর নির্দেশ দিতে পরামর্শ দেন। পুলিশ সুপার মহোদয় আমাকে ফোন দিয়ে বলেন-
-৩০২ ধারায় মামলা নিলে সমস্যা কোথায়? 
-স্যার আমি আইনের যথাযথ ধারায় মামলা নিচ্ছি। এতে আল্লাহর কাছে আমাদের জবাবদিহিতা করতে হবে না। আমার বিশ্বাস ঘটনা সাতদিনের মধ্যেই উদঘাটিত হবে। আল্লাহ আমাদের পথ দেখাবেন। 
-Ok Carry-on. Detect the case immediately. 

আইনের যথাযথ ধারায় অজ্ঞাতনামা একাধিক আসামির বিরুদ্ধে একটি অজ্ঞাতনামা মেয়েকে গণধর্ষণ করে মৃত্য সংঘটনের জন্য একটি নিয়মিত মামলা রুজু করলাম। 

মৃতদেহ উদ্ধারের আগের দিন এক ভদ্রমহিলা থানায় এসে এই মর্মে সাধারণ ডায়রি করেন। যে তার তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়ে কাউকে কিছু না বলে বাড়ি থেকে চলে গেছে। তাঁকে পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি প্রকৃত ঘটনা গোপন করে জিডি করেন। 

মৃতদেহ উদ্ধারের পরদিন মহিলাকে তাঁর মেয়ের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য থানায় উপস্থিত হতে সংবাদ দিলে তিনি উপস্থিত হন। মেয়ের কথা জিজ্ঞেসাবাদ করলে তিনি জানান ‘স্যার আমার মেয়ে অনেক সুন্দর, চুল পায়ের ঘন্টা পর্যন্ত। আমি এতেই নিশ্চিত হয়ে যাই।’

এসআই পরেশকে ডাকি। পরেশ আসলে আলামত আনতে বলি। থানার মুন্সি জানায় মালখানা অফিসার ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মামুনুর রশীদ ছুটিতে চলে গেছেন। তিনি মালখানার চাবি দিয়ে যাননি। আলামত মালখানায় আছে। বললাম তালা ভেঙে আলামত বের কর। আলামত তালা ভেঙে আনা হলো। আলামত দেখে মহিলা চিৎকার দিয়ে অজ্ঞান হয়ে গেলেন।

জ্ঞান ফিরলে মহিলা জানান- ‘আমি আমার মেয়েকে শাহপরান মাজার থেকে আমার খালাতো ভাইয়ের সাথে দিয়ে বলছিলাম গোলাপগঞ্জের বাড়িতে পৌঁছে দিতে। স্যার আমার খালাতো ভাইকে ধরেন। সে সব জানে। 

মহিলাকে সাথে নিয়ে তাঁর খালাতো ভাই জসীমকে ধরলাম। জসীমের দুইজন সহযোগীকে জসীমের স্বীকারোক্তির উপর ভিত্তি করে ধরলাম। তাদের ব্যাবহৃত সিএনজিটি উদ্ধার করলাম। সকল আসামি স্বীকার করলো তাঁরা সকলেই একাধিকবার ধর্ষণ করে। একসময় মেয়েটির মৃত্যু হয়। পরদিন জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আসামি তিনজন স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দি প্রদান করে। 

ভদ্রমহিলার স্বামী কুয়েত প্রবাসী। তিনি কেন শাহপরান মাজারে খালাতো ভাই জসীমের সাথে গিয়েছিলেন এবং কেন তিনি মেয়েকে বাড়ি পৌঁছাতে জসীমের সাথে দিয়েছিলেন। কেন তিনি পুলিশের নিকট সবকিছু গোপন করে মেয়ে হারিয়ে গেছে মর্মে থানায় জিডি করেছিলেন। এ বিষয়টি আমি যৌক্তিক কারণেই গোপন রাখতে বাধ্য হচ্ছি।

মামলার রহস্য উদঘাটনের পর সিলেটের পুলিশ সুপার এসএম রুহুল আমিন (বর্তমানে অতিরিক্ত আইজিপি) আমাকে জিজ্ঞেস করেন ‘আপনি এতো আত্মবিশ্বাসী হোন কিভাবে। বলছিলেন সাতদিন লাগবে, লাগলো তিনদিন।’

স্যারকে বলেছিলাম আন্তরিকতা ও স্বচ্ছতা থাকলে সৎ সাহস ও আত্নবিশ্বাস চলে আসে। কাজে গতিশীলতা আসে।    

মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল করা হলো। স্বাক্ষী দিতে গেলাম। স্বাক্ষী শেষে জজ সাহেব মামলার তদন্তে অতিমাত্রায় সন্তোষ প্রকাশ করেন। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচার হলো একবছর পরে রায় হলো। আসামি তিনজনের মৃত্যুদণ্ড হলো। মৃত্যুদণ্ডও কার্যকরও হয়েছে।

আমি যদি একটি হত্যা মামলা রুজু করতাম তাহলে হয়তো মেয়েটির আত্মা বিচারের আশায় ঘুরে বেড়াতো। জীবনের প্রতিটি কাজের সময় চিন্তা করেছি আল্লাহর দরবারে কি জবাব দেব। বিবেক যা বলছে তাই করেছি।

সালেহ উদ্দিন আহমেদ,অতিরিক্ত পুলিশ সুপার

আইনিউজ ইউটিউব চ্যানেলে ‍দেখুন আকর্ষণীয় সব ভিডিও

নয় বছরের মেয়েটি কিভাবে নেভায় একের পর এক আগুন?

মৌলভীবাজারে ট্যুরিস্ট বাস চালু

যেসব দেশে যেতে বাংলাদেশিদের লাগবে না ভিসা

Green Tea
সোশ্যাল মিডিয়া বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
সর্বশেষ
জনপ্রিয়