ঢাকা, বুধবার   ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০,   আশ্বিন ৮ ১৪২৭

মুনির হাসান

প্রকাশিত: ১১:৪৩, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০
আপডেট: ১১:৫১, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০

কি নিদারুন অবহেলায় এখানে আছেন মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম

সম্প্রতি তাহিরপুরের টেকেরঘাটে ঘুরতে গিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলামের কবর অবহেলায় থাকতে দেখে সেই আফসোস নিজের ফেসবুক ওয়ালে শেয়ার করেছেন মুনির হাসান ।  তিনি লেখেন-

কি নিদারুন অবহেলায় এখানে শুয়ে আছেন দেশের সেরা সন্তানেরা, অসীম সাহসিকতায় জীবন কে তুচ্ছ করা আমাদের পূর্ব পুরুষেরা ।

কে এই গেরিলা ? কে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম ?

১৯৫২ সালে কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার ছিলনী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন সিরাজুল ইসলাম। বাবা-মা ও কাছের মানুষেরা তাকে আদর করে সিরু নামে ডাকতেন। বাবা মকতুল হোসেন এবং মা গফুরুন্নেছা দম্পতির একমাত্র পুত্রসন্তান ছিলেন তিনি। তার ছোট দুটি বোনও ছিল। ১৯৭১ সালে সিরাজ ছিলেন উনিশ বছরের টগবগে যুবক। এসময় তিনি ছিলেন কিশোরগঞ্জ গুরুদয়াল কলেজের বিএ প্রথম বর্ষের ছাত্র। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে তিনি এতে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন এবং নিজ গ্রামের কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। একমাত্র পুত্রের এমন সিদ্ধান্ত কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না সিরাজের বাবা-মা।

জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে একদিন বাড়ি থেকে বের হয়ে বাড়ির সামনে দিয়ে যে সড়কটি ইটনা সদরের দিকে চলে গেছে সেই পথেই হাঁটা শুরু করেছিলেন সিরাজ। তার বাবা দৌড়ে এসে সেই সড়কে দাঁড়িয়ে ছেলের চলে যাওয়া দেখছিলেন। যতক্ষণ তার প্রিয় পুত্র সিরুকে দেখা যায় ততক্ষণ তিনি সেখানেই নিশ্চল দাঁড়িয়েছিলেন। পরে দৃষ্টিসীমায় সিরু মিলিয়ে যাওয়ার পর তিনি ধপ করে মাটিতে বসে পড়েন। হয়তো, তিনি বুঝেছিলেন এটাই ছিল সিরুকে তার শেষ দেখা।

দাস পার্টির নির্ভীক গেরিলা

বন্ধুদের নিয়ে হাওর-বাঁওড় পাড়ি দিয়ে মুক্তিবাহিনীতে নাম লেখান সিরাজ। পরে তিনি তার দল নিয়ে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য ভারতের আসামে ইকোয়ান ক্যাম্পে চলে যান। প্রশিক্ষণ শেষে তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং ৫ নম্বর সেক্টরের অধীনে দাস পার্টি নামে একটি গেরিলা দলে সাব-সেক্টর কমান্ডার হিসেবে যুদ্ধ শুরু করেন।

দাস পার্টি ছিল দুর্ধর্ষ একটি গেরিলা দল। এই দলের নেতৃত্বে ছিলেন বীরবিক্রম জগৎজ্যোতি দাস। হাওর অঞ্চলটি ছিল জগৎজ্যোতির নখদর্পণে। তাই তার বাহিনী নিয়ে বেশ কয়েকটি দুর্ধর্ষ ও সফল গেরিলা অপারেশন পরিচালনা করেছিলেন তিনি। বাংলার ভাটি অঞ্চলের সুনামগঞ্জ-কিশোরগঞ্জ-নেত্রকোনা এবং হবিগঞ্জের হাওরাঞ্চল নিয়ে গঠিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের ৫ নম্বর সেক্টর। এই সেক্টরকে কয়েকটি সাব-সেক্টরে বিভক্ত করা হয়। এর মধ্যে টেকেরঘাট সাব-সেক্টরের অধীনে জগৎজ্যোতি বিভিন্ন আক্রমণে অংশগ্রহণ করেন। তার নেতৃত্বে প্রশিক্ষিত যোদ্ধাদের নিয়ে গঠিত হয় গেরিলা দল, যার নাম দেওয়া হয় ফায়ারিং স্কোয়াড ‘দাস পার্টি’। জগৎজ্যোতির শেষ যুদ্ধের অন্যতম সঙ্গী আবদুল কাইয়ুমের বয়ানে জানা যায়, দাস পার্টি নামটি জনগণের দেওয়া নাম নয়, দাস পার্টির অফিশিয়াল দলিল ছিল এবং পার্টি কমান্ডার হিসেবে জগৎজ্যোতি স্বীকৃতি পেয়েছিলেন।

জগৎজ্যোতি ইংরেজি, হিন্দি, গৌহাটির আঞ্চলিক ভাষায় পারদর্শী হওয়ায় ভারতীয় মিত্র বাহিনীর সঙ্গে তার যোগাযোগ সহজতর হয়। এর ফলে দাস পার্টির জন্য ভারতীয় মিত্র বাহিনীর আধুনিক অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহে সমর্থ হন জগৎজ্যোতি। দাস পার্টির উল্লেখযোগ্য একটি অপারেশন ছিল পাক বাহিনীর বার্জ আক্রমণ। ১৯৭১-এর ১৬ অক্টোবর পাক বাহিনীর সেই বার্জটিতে আক্রমণ চালিয়ে এটিকে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। এই বাহিনীর গেরিলা অভিযানে বেশ কয়েকটি পাকিস্তানি শত্রু ঘাঁটি ধ্বংস করা হয়। পাহাড়পুর অপারেশন, সাচনা বাজার ও জামালগঞ্জ থানা অপারেশন, বানিয়াচংয়ে কার্গো বিধ্বস্ত করা, বানিয়াচং

থানা অপারেশনসহ বেশ ক’টি ছোট-বড় অপারেশন দাস পার্টির যোদ্ধারা সফলভাবে সম্পন্ন করেন।

দাস পার্টির দৌরাত্ম্যের জন্যই হাওর অঞ্চলে বিপুল সেনা ও যুদ্ধ সরঞ্জাম জড়ো করেছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। পরে ১৯ নভেম্বর আজমিরিগঞ্জের বদলপুরে দুপক্ষের মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। এই যুদ্ধে অসীম বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করে প্রাণ হারান দাস পার্টির প্রধান জগৎজ্যোতি। জানা যায়, রাজাকার এবং পাক বাহিনী সদস্যরা তার লাশটিকে আজমিরিগঞ্জের বাজারে নিয়ে যায় এবং সেখানে একটি খুঁটির সঙ্গে পেরেক মেরে ঝুলিয়ে রাখে। তবে, এই বাহিনীর আরেক বীর যোদ্ধা সিরাজ সাচনা বাজার দখল করতে গিয়ে আগস্টেই প্রাণ হারিয়েছিলেন। ওই যুদ্ধে ৩৬ জন পাক সেনার বিপরীতে ৮ জন মুক্তিযোদ্ধা প্রাণ হারান।

সাচনা বাজার যুদ্ধে শহীদ সিরাজ

ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে দাস পার্টির সঙ্গে যোগ দেওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই হাওর অঞ্চলের জামালগঞ্জ থানা এবং সাচনা বাজারে আক্রমণ করার পরিকল্পনা করে মুক্তিযোদ্ধারা।

এই আক্রমণের জন্য গুরুত্ব বিবেচনায় মুক্তিযোদ্ধাদের তিনটি দল নির্বাচিত হয়। প্রথম দলটিতে ছিলেন কমাণ্ডার ইপিআরের আব্দুল হাই এবং সেকেন্ড ইন কমান্ড সিরাজুল ইসলাম। এই দলটির দায়িত্ব ছিল- সাচনা বাজারের বাংকারগুলো আক্রমণ করা। জগৎজ্যোতি ও তার সেকেন্ড ইন কমান্ড আলী আজমদের ওপর দায়িত্ব পড়ে জামালগঞ্জ থানা সদরের বাংকারগুলো দখলে নেওয়ার জন্য। মোজাহিদ মিয়া ও ইব্রাহিম খলিলের নেতৃত্বে আরেকটি দল রাখা হয় ব্যাকআপ পার্টি হিসেবে।

৭ আগস্ট ছয়টি বড় নৌকা নিয়ে টেকেরঘাট থেকে এসে তিনটি দল একযোগে আক্রমণ শুরু করে। জগৎজ্যোতির দল জামালগঞ্জ থানা আক্রমণ করার পর পাক সেনারা দক্ষিণ দিকে পালাতে

থাকলে মোজাহিদ মিয়ার নেতৃত্বে তৃতীয় দলটির প্রতিরোধের মুখে পড়ে। পরে পাক সেনাদের দলটি দুর্লভপুর গ্রামের দিকে পালাতে শুরু করে।

একই সময়ে নদীর অপর পাড় সাচনা বাজারে আব্দুল হাই ও সিরাজের দল একের পর এক গ্রেনেড চার্জ করতে করতে এগিয়ে যেতে থাকে। সিরাজ ও তার বাহিনীর তীব্র আক্রমণের মুখে বাংকারে অবস্থান করা বেশ কয়েকজন পাক আর্মি ও রাজাকার মারা যায়। বাকিরা পালিয়ে যেতে থাকে। পালাতে পালাতে বাজারের ভেতরের একটা বাংকারে গিয়ে তারা জড়ো হয়। সিরাজ অসীম বীরত্বের সঙ্গে ক্রলিং করে এগিয়ে গিয়ে সেই বাংকারে গ্রেনেড চার্জ করেন। কিন্তু পলায়নরত সেনাদের একটি গুলি তার কপালে এসে আঘাত করে। পাকসেনা ও রাজাকাররা পালিয়ে গেলেও গুরুতর আহত হন সিরাজ। সঙ্গে সঙ্গে তাকে মিত্র বাহিনীর হেলিকপ্টারে করে ভারতে নেওয়ার পথে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। এ অবস্থায় তার লাশ নিয়ে হেলিকপ্টারটি ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে টেকেরঘাটে অবতরণ করে। সেখানে খাসিয়া পাহাড়ের পাদদেশে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় তার দাফন সম্পন্ন হয়। সিরাজ শহীদ হওয়ার পর তার বন্ধুরা দাস পার্টি থেকে আলাদা হয়ে কিশোরগঞ্জ অঞ্চলে গিয়ে যুদ্ধ করে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধের কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের জন্য সরকার শহীদ সিরাজকে বীরবিক্রম খেতাব প্রদান করে। টেকেরঘাটে এখনো সিরাজের কবরটি আছে। তবে অযত্ন, অবহেলায় তার জীর্ণদশা। যুদ্ধের পর সাচনা বাজারের নামকরণ করা হয় ‘সিরাজ নগর’ নামে। যদিও প্রয়োজনীয় উদ্যোগের অভাবে পরে আর এই নামটি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সিরাজের আত্মত্যাগে সাচনা বাজার বিজয়ের পর এই বিজয়কে ধরে রাখার জন্য সাব-সেক্টর থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের আরেকটি দল স্থায়ীভাবে এসে ঘাঁটি করে সেখানে। পরে অনেক চেষ্ট করেও পাক সেনারা এই বাজারটি মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে পারেনি।

পিতাকে লেখা শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম বীর বিক্রমের শেষ চিঠি ।
প্রিয় আব্বাজান
টেকেরঘাট তাং-৩০-০৭-৭১ ইং
আমার সালাম নিবেন, আশা করি খোদার কৃপায় ভালই আছেন। বাড়ির সকলকেই আমার শ্রেণিমত সালাম ও স্নেহ রহিল। আলীরাজ, রওশন, মাতাব, রনু, ইব্রাহীম, ফুল মিয়া, সকলেই একত্রে আছি। দেশের জন্য আমরা সকলেই জান কোরবান করিয়াছি। আমার জন্য ও দেশ স্বাধীন হওয়ার জন্য দোয়া করবেন। আমি জীবনকে তুচ্ছ মনে করি। কারণ দেশ স্বাধীন না হইলে জীবনের কোন মূল্য থাকিবে না। তাই যুদ্ধই জীবনের পাথেয় হিসাবে নিলাম। আমার অনুপস্থিতিতে মাকে কষ্ট দিলে আমি আপনাদেরকে ক্ষমা করিব না। পাগলের সব জ্বালা সহ্য করিতে হইবে। চাচা, মামাদের ও বড় ভাইয়ের নিকট আমার সালাম। বড় ভাইকে চাকুরীতে যোগদান করিতে নিষেধ করিবেন। জীবনের চেয়ে চাকুরী বড় নয়। দাদুকে দোয়া করিতে বলিবেন। মৃত্যুর মুখে আছি। যে কোন সময় মৃত্যু হইতে পারে এবং মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত। দোয়া করবেন মৃত্যু হইলেও যেন দেশ স্বাধীন হয়। তখন দেখিবেন লাখ লাখ ছেলে বাংলার বুকে পুত্র হারাকে বাবা বলে ডাকবে। এই ডাকের অপেক্ষায় থাকুন। আর আমার জন্য চিন্তার কোন কারণ নেই। আপনার দুই মেয়েকে পুরুষের মত শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলবেন। তবেই আপনার সাধ মিটে যাবে। দেশবাসী স্বাধীন বাংলা কায়েমের জন্য দোয়া কর। মীর জাফরী করিও না। কারণ মুক্তি ফৌজ তোমাদের ক্ষমা করিবে না এবং বাংলায় তোমাদের জায়গা দিবে না। সালাম, দেশবাসী সালাম।

ইতি
মোঃ সিরাজুল ইসলাম
 

(লেখকের ফেসবুক থেকে সংগৃহীত )

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়