ঢাকা, সোমবার   ২৬ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ১০ ১৪২৭

ডেস্ক নিউজ

প্রকাশিত: ২১:৪৩, ১৩ অক্টোবর ২০২০
আপডেট: ২১:৪৩, ১৩ অক্টোবর ২০২০

পাপুয়া নিউগিনির জেলে থাকা বাংলাদেশি হেলালের গল্প সিনেমাকেও হার মানায়

হেলাল উদ্দিন

হেলাল উদ্দিন

অবৈধ অভিবাসী হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিসমাস দ্বীপে পা রেখেছিলেন ৩০ বছর বয়সী এক বাংলাদেশি যুবক। বেআইনিভাবে প্রবেশের অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করে পাঠিয়ে দেয়া হয় পাপুয়া নিউগিনির এক কুখ্যাত কারাগারে। সাত বছরের লড়াইয়ে তিনি সাক্ষী হয়েছেন নির্মম হত্যাকাণ্ডের।  দেশ ছেড়ে নৌকা করে অকূল সমুদ্র পাড়ি দিতে দেখেছেন বন্ধুদের লাশ। কারাগার থেকে কারাগারে ঘুরতে ঘুরতে পেয়েছেন প্রেমের সন্ধান, এরপর বিয়ে এবং হয়েছেন সন্তানের পিতাও। এখন তিনি আবারও কারাগারে। এ যেন সিনেমাকেও হার মানায়।

মঙ্গলবার অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যম এসবিএস নিউজের এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বাংলাদেশি হেলাল উদ্দিনের দীর্ঘ সংগ্রাম। যিনি হেলাল ‘স্পাইসি’  উদ্দিন নামে পরিচিত।

এপ্রিলে পাপুয়া নিউগিনির আদালত হেলাল উদ্দিনকে অতি সত্বর মুক্তি দিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি নির্দেশ দেয়। সেই সঙ্গে তাকে দেশটিতে তিন বছরের জন্য বসবাসের অনুমতি দেয়। কিন্তু মুক্তির আনন্দ অল্পতে দুঃস্বপ্নে পরিণত হলো এ বাংলাদেশির। কারাগার থেকে ছাড়ার পাওয়ার ১০ দিন পর আবার ফের বন্দী জীবনে ফিরে গেলেন তিনি।

শুরুতে বন্দী ছিলেন মানুস দ্বীপের কুখ্যাত কারাগারে। মুক্তি পেয়ে ঠাঁই হলো দেশটির মূল ভূখণ্ডের বোমানা কারাগারে। মাঝখানে তাকে ফেরত পাঠানো হয়েছিল বাংলাদেশে। প্রেমের টানে অবৈধভাবে সমুদ্রপথে আবার ছুটে যান পাপুয়া নিউগিনিতে।

সেখান থেকে তিনি এসবিএসকে জানান, ‘আমার জীবন নিয়ে সিনেমা হওয়া উচিত।’

যে কারণে দেশ ছাড়লেন

কেন তিনি অভিবাসী হলেন, এমন প্রশ্নের জবাবে বের হয়ে আসে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি। বাংলাদেশের কোন জেলায় তার বাড়ি সেটি সম্পর্কে প্রতিবেদনে কিছু বলা হয়নি। তিনি জানান, গ্রামে সরকারবিরোধী এক বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। হেলাল উদ্দিন বলছেন, বিরোধী দলকে সমর্থন করায় তাকে জেল-জুলুম সইতে হবে এমন শঙ্কা থেকে তিনি অবৈধভাবে দেশ ছাড়েন।

কেন তিনি ‘স্পাইসি’ উদ্দিন

রাজধানী ঢাকায় তিনি ‘বাবুর্চি’ পেশায় জড়িত ছিলেন। মানুস দ্বীপের ডিটেনশন সেন্টারে বন্দী অন্যান্য অভিবাসীদের জন্য তিনি রান্না করতেন। সেখান থেকে তার নামের সঙ্গে জুড়ে যায় ‘স্পাইসি’ শব্দটাও। পরবর্তীতে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে দেন খাবারের দোকান।

বন্দী দশা থেকে মুক্তি

২০১৬ সাল পর্যন্ত মানুসের কুখ্যাত কারা প্রকোষ্ঠে বন্দী ছিলেন হেলাল উদ্দিন। ডিটেনশন সেন্টারটির বন্দীদের ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে অস্ট্রেলিয়া সরকার সেটি বন্ধ ঘোষণা করে। পাপুয়া নিউগিনিতে অবস্থিত হলেও অভিবাসী ডিটেনশন সেন্টারটি মূলত গড়ে তোলে অস্ট্রেলিয়া।

পাপুয়া নিউগিনি আদালত ঘোষণা দেয় যে, অন্যায়ভাবে মানুসের কারা পরিবেশে দুই বছর ছয় মাস আটকে রাখা হয় হেলাল উদ্দিনকে।

প্রেমে জড়ানো ও বিয়ে

মানুস থেকে মুক্তি পাওয়ার পর ওই দ্বীপেই পরিচয় হয় তরুণী অ্যালিস মিখাইলের সঙ্গে। তার সঙ্গে প্রেম হয় হেলাল উদ্দিনের। ২০১৭ সালের মার্চে তারা বিয়ে করেন। এ বাংলাদেশি যুবক বলেন, ‘মুক্তি পাওয়ার পর একটি চাইনিজ সুপারমার্কেটে আমার স্ত্রীকে পেয়ে যাই। আমি তার প্রেমে পড়ি, তাকে বিয়ে করি।’

তাদের একটি সন্তানও হয়, নাম রাখেন মোহাম্মদ আলী। এরপর স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সুখেই জীবনযাপন করছিলেন হেলাল উদ্দিন। টোরেনগাউ শহরে ছোট একটি খাবারের দোকান খুলে ভালোই চলছিল তার।

ফের কারাবরণ ও বাংলাদেশে ফেরত

২০১৮ সালের মার্চে এসে আবারও ভাগ্যের কাছে হার মানলেন হেলাল উদ্দিন। কর্তৃপক্ষ ‘শরণার্থী’ হিসেবে তার বসবাসের অনুমতি বাতিল করে দেয় এবং গ্রেপ্তার করে। পাপুয়া নিউগিনির অভিবাসী বিষয়ক মন্ত্রী রিমবিঙ্ক পাতো জানান, দেশটিতে তার বসবাস অবৈধ। স্বেচ্ছায় দেশত্যাগ না গেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এমন পরিস্থিতিতে তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘তারা আমাকে দেশটি ছাড়তে বাধ্য করেছিল। কিন্তু আমার প্রেম আমাকে আবার এখানে ফিরিয়ে এনেছে।’

তিনি বলেন, ‘দিন রাত স্ত্রী-পুত্রের জন্য শুধু কাঁদতাম। সারাক্ষণ চিন্তা করতাম আমার ছেলে কীভাবে খাচ্ছে, কীভাবে খেলছে। কীভাবে তারা আছে এ চিন্তা করতাম শুধু।’

আবার পাপুয়া নিউগিনি, সমুদ্রপথে অন্য যুদ্ধ

বৈধভাবে পাপুয়া নিউগিনিতে ফিরে যেতে তিনি ভিসার আবেদন করেছিলেন। কিন্তু তার সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় তিনি বাংলাদেশ থেকে নৌকায় চড়ে থাইল্যান্ড এবং ইন্দোনেশিয়া হয়ে আবার পাপুয়া নিউগিনিতে পৌঁছান। এবারও ভিসা বা পাসপোর্ট কিছুই ছিল না তার। হেলাল উদ্দিন বলছেন, ছয় সপ্তাহের সেই নৌকা ভ্রমণে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার শিকার হন। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সমুদ্র সীমানার কাছে তার তিন বন্ধুকে গুলি করে মেরে ফেলা হয়।  তার বেঁচে থাকাকে তিনি ‘অলৌকিক’ বলছেন।

মানুসের কারাপ্রকোষ্ঠে ফিরে যাওয়া

মানুস দ্বীপের পশ্চিমে নেমে তিনি তার স্ত্রী ও সন্তানের সঙ্গে মিলিত হন। আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যান তিনি। কিন্তু কয়েক মাস পর আবারও গ্রেপ্তার হন তিনি। তার ব্যবসার জন্য বৈধ কাগজপত্র তুলতে গিয়ে ধরা পড়ে যান তিনি। এবারও অভিযোগ, অবৈধ অনুপ্রবেশ।

তিনি বলেন, ‘আমি একজন ভালো লোক। আমি বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে পাপুয়া নিউগিনিতে এসেছি। কিন্তু ভালোবাসার টানেই এটি আমি করেছি।’ 

হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘কোনো ধরনের চাকরি ও অর্থ ছাড়া ছেলেকে নিয়ে আমার স্ত্রী বেঁচে থাকার লড়াই করছে। আমাকে প্রয়োজন তাদের। এখন আমি কী করব।’ তিনি বলেন, ‘আমি আমার স্ত্রীকে চাই, আমার পরিবারকে চাই। আমাকে ছাড়া তারা খুব খারাপ অবস্থায় আছে।’

১০ দিনের মুক্তি

২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা তার এই কেসটি সম্পর্কে জানতে পারে। তাদের আইনি প্রচেষ্টার পর এ বাংলাদেশি যুবককে মুক্তির জন্য নির্দেশ দেন পাপুয়া নিউগিনির আদালত। সব মিলিয়ে দেশটিতে তিন বছর সাত মাস জেলে ছিলেন তিনি। মুক্তি ও স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পেলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আপিল করে জিতলে আবারও তাকে ফিরে যেতে হয় কারাগারে। মাঝখানে মাত্র ১০ দিন তিনি কারাগারের বাইরে ছিলেন। এখন তিনি পাপুয়া নিউগিনির মূল ভূখণ্ডের বোমানা কারাগারে বন্দী।

ফের অনিশ্চিত জীবন

অস্ট্রেলিয়া থেকে তাকে আইনি সহায়তা দেয়া ইয়ান রিনতুল বলেন, ‘আমরা ন্যাশনাল কোর্টে জিতেছিলাম। তিনি মুক্তি হয়েছিলেন। কিন্তু সেই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল হওয়ায় আবার গ্রেপ্তার হন। তার কেসটি এখন সুপ্রিম কোর্টে আছে। এখনো শুনানির তারিখ হয়নি।’

হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘জানি না, কখন আমি আমার পরিবারকে দেখব। আমার ছেলে আমার সঙ্গে আসতে চেয়েছিল। আমি তাকে বলেছি, আমি কারাগারে যাচ্ছি। এটি বলাটা কী কঠিন বোঝানো যাবে না।’ তিনি বলেন, ‘আমার এ গল্প, আমার জীবনে যা ঘটেছে, জানি না, অন্য কোনো শরণার্থীর জীবনে এমনটি ঘটেছে কী না।’

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়