Bilas Moulvibazar, Bilas

ঢাকা, বুধবার   ১৪ জানুয়ারি ২০২৬,   মাঘ ১ ১৪৩২

কমলগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৯:১৯, ১৩ জানুয়ারি ২০২৬

আধুনিকতার ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী চুঙ্গাপুড়া পিঠা

আধুনিকতার ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী চুঙ্গাপুড়া পিঠা। ছবি: আই নিউজ

আধুনিকতার ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী চুঙ্গাপুড়া পিঠা। ছবি: আই নিউজ

সিলেট অঞ্চলের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী খাবারের তালিকায় এক সময় বিশেষ স্থান দখল করে ছিল চুঙ্গাপুড়া পিঠা। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে সেই চিরচেনা ঐতিহ্য আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। গ্রামীণ জনপদে আর আগের মতো চুঙ্গাপুড়া পিঠার আয়োজন চোখে পড়ে না। শীতের রাতে খড়কুটো জ্বালিয়ে সারা রাত ধরে চুঙ্গাপুড়া তৈরির দৃশ্য এখন স্মৃতির পাতায় বন্দি।

একসময় শীত এলেই বাজারে বসত মাছের মেলা। সেখান থেকে কিংবা হাওর-নদী থেকে ধরা হতো রুই, কাতলা, চিতল, বোয়াল, পাবদা, কই ও মাগুর মাছ। এসব মাছ হালকা মসলা দিয়ে ভেজে স্থানীয় ভাষায় ‘মাছ বিরাণ’ চুঙ্গাপুড়া পিঠার সঙ্গে খাওয়াই ছিল সিলেট ও মৌলভীবাজার অঞ্চলের এক অনন্য ঐতিহ্য।

বাড়িতে মেহমান বা নতুন জামাই এলে চুঙ্গাপুড়া পিঠা, মাছ বিরাণ ও নারিকেলের পিঠা পরিবেশন না করলে যেন লজ্জায় পড়তে হতো। অথচ আজ সেই সংস্কৃতি অনেকটাই হারিয়ে গেছে। চুঙ্গাপুড়া পিঠা তৈরির প্রধান উপকরণ ঢলু বাঁশ ও বিন্নি ধানের চাল (বিরইন চাল) এখন দুষ্প্রাপ্য। আগের মতো এসব উপকরণের চাষ ও প্রাপ্যতাও নেই।

একসময় মৌলভীবাজারের বড়লেখার পাথরিয়া পাহাড়, জুড়ীর লাঠিটিলা, রাজনগর, কমলগঞ্জের উঁচু-নিচু টিলা, চা-বাগান ও জুড়ী উপজেলার চুঙ্গাবাড়ী এলাকায় প্রচুর ঢলু বাঁশ পাওয়া যেত। কিন্তু বনদস্যুতা, ভূমিদস্যুতা ও পাহাড়খেকোদের কারণে বনাঞ্চল উজাড় হয়ে যাওয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে এই বিশেষ বাঁশ। বর্তমানে জেলার কিছু টিলায় সীমিত পরিমাণে ঢলু বাঁশ পাওয়া গেলেও তার দাম বাজারে বেশ চড়া।

চুঙ্গাপুড়া পিঠা তৈরিতে ঢলু বাঁশের বিকল্প নেই। এই বাঁশে থাকা বিশেষ ধরনের তৈলাক্ত রাসায়নিক উপাদান আগুনে চুঙ্গাকে পোড়ার হাত থেকে রক্ষা করে। ঢলু বাঁশে প্রচুর রস থাকায় আগুনে না পুড়ে ভেতরের পিঠা তাপে ধীরে ধীরে সিদ্ধ হয়ে যায়। কোনো কোনো এলাকায় চুঙ্গার ভেতরে বিন্নি চাল, দুধ, চিনি, নারিকেল ও চালের গুঁড়া দিয়ে পিঠা তৈরি করা হয়। পিঠা তৈরি হয়ে গেলে মোমবাতির মতো করে চুঙ্গা থেকে আলাদা হয়ে আসে। এই পিঠা পোড়াতে প্রচুর খড় বা নেরার প্রয়োজন হয়।

পিঠা তৈরির জন্য কমলগঞ্জ উপজেলার মুন্সীবাজারে ঢলু বাঁশ কিনতে আসা পিন্টু ও প্রনীত দেবনাথ বলেন, “এগুলো সব সময় পাওয়া যায় না। পৌষসংক্রান্তি উপলক্ষে অল্প পরিমাণে বাজারে উঠেছে। ১০-১৫ বছর আগে প্রচুর দেখা যেত। এখন কালের পরিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে। পরিবারের জন্য পিঠা বানাতে কয়েকটা বাজার ঘুরে শেষে মুন্সীবাজারে অল্প কিছু ঢলু বাঁশ পেয়েছি।”

কমলগঞ্জ উপজেলার লেখক ও কবি সাজ্জাদুল হক স্বপন বলেন, “চুঙ্গাপুড়া পিঠার ভেতরে লুকিয়ে থাকে এক অনন্য স্বাদ। একটু ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে খেলে সেই স্বাদ অনুভব করা যায়। এটি সিলেট অঞ্চলের পিঠে-পুলির এক প্রাচীন ঐতিহ্য। কিন্তু প্রয়োজনীয় ঢলু বাঁশ না থাকায় এই পিঠা আজ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।”

সংশ্লিষ্টদের মতে, সঠিক উদ্যোগ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের মাধ্যমে চুঙ্গাপুড়া পিঠাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচিত করে তোলা না গেলে সিলেটের এই ঐতিহ্য একদিন শুধুই ইতিহাস হয়ে থাকবে।

ইএন/এসএইচএ

Green Tea
সারাবাংলা বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
সর্বশেষ
জনপ্রিয়