ঢাকা, রোববার   ০১ আগস্ট ২০২১,   শ্রাবণ ১৭ ১৪২৮

আলমগীর শাহরিয়ার

প্রকাশিত: ২০:৩৭, ১১ জুন ২০২০
আপডেট: ২২:২৮, ১১ জুন ২০২০

মানুষ কি একদিন লিখতে ভুলে যাবে?

যখন কোনো পোস্ট দিই সেটা ভালো লাগলে অনেক বন্ধুরা দেখি রেডিমেইড স্টিকার কমেন্ট যেমন, লাভ দিস, বিউটিফুল, কংগ্রাচুলেশনস, নাইস, থ্যাঙ্ক ইউ— এসব দিয়ে নিষ্কৃতি লাভ করেন। ফেসবুকে আমি সচরাচর এই স্টিকারগুলো ব্যবহার করি না। কারো কিছু পছন্দ হলে এক দুইটি বাক্য, সম্ভব না হলে অন্তত একটা শব্দ হলেও নিজ হাতে লিখি। এক দুইটি শব্দ লিখতে হয়তো সেকেন্ড বা মিনিটের ভগ্নাংশ সময় লাগে। তবু লেখাই উচিত। স্টিকার কমেন্ট দিয়ে হয়তো অনেকে সময় বাঁচানোর কথা বলবেন। সত্যি কী আমরা সময়ের সযত্ন ব্যবহারে খুব তৎপর?

আসলে একটু লিখতে হলে ভাবতে হয়। ভাবনার পাশাপাশি বানানটাও সঠিক কি না খেয়াল করতে হয়। প্রয়োজনে ডিকশনারিটা চেক করতে হয়। কখনো গুগল করতে হয়। মস্তিষ্ক এই কষ্ট বা চাপটুকু নিতে চায় না। কিন্তু তাই করা উচিত। একটু হলেও এতে চর্চা হয়। না হলে এভাবে ধীরে একদিন আমরা চিন্তাশূন্য ও যন্ত্রনির্ভর হয়ে যাব। হয়ে যাচ্ছি, হয়ে গেছি অনেকাংশে ইতোমধ্যেই।

পৃথিবীতে প্রচুর মানুষ একদিন হাতে লেখা ভুলে যাবে। হাতে লেখার ব্যাপারটাই হারিয়ে যেতে পারে। ছোটবেলা নিজেই বিলেতে, মধ্যপ্রাচ্যে আত্মীয় স্বজনের কাছে, কোনো বড় আপু, ভাই, বন্ধুর প্রেমপত্রসহ কত শত চিঠিপত্র লিখেছি তার ইয়ত্তা নাই। আমাদের চোখের সামনেই তো সে চল উঠে গেল। বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ লেখক রবীন্দ্রনাথ হাজার হাজার গান, শত শত কবিতা, প্রবন্ধ ও উপন্যাস নিজ হাতেই লিখেছেন। প্রচুর চিঠি লেখার অভ্যাস ছিল বলে ইন্দিরা দেবীকে লেখা চিঠিপত্রের সমাহার ছিন্নপত্রের মতো শ্রেষ্ঠ লেখা আমরা পেয়েছি। এমনকি কম্পিউটার যুগে হুমায়ূন আহমেদও ঘরের মেঝেতে বসে তিনশোর বেশি উপন্যাস হাতেই লিখেছেন। ভিন্ন উদাহরণও আছে। সৈয়দ শামসুল হক লিখতেন কম্পিউটারে।

যন্ত্রপ্রযুক্তি আর যুগের পরিবর্তনটা নিজ চোখে দেখলাম। আমরা যেমন এখন গুহাচিত্র দেখি— ভবিষ্যতের মানুষ জাদুঘরে আমাদের হাতের লেখা ডকুমেন্টস দেখবে। আর বলবে আহা আমাদের পূর্বপুরুষরা নিজ হাতে কি সুন্দর আঁকিবুকি করত।

মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে পৃথিবীতে টিকে আছে কেননা মানুষ অনন্য চিন্তাশীল প্রাণী। প্রাণী জগতে মানুষেরই রয়েছে পৌনঃপুনিকতা বা পুনরাবৃত্তি এড়িয়ে প্রতিনিয়ত ভিন্নতর সৃজন ও উদ্ভাবনী শক্তি। ফুলে ফুলে ঘুরে ঘুরে মৌমাছির মধু আহরণ সৃজনশীল কাজ কিন্তু এতে নতুনত্ব নেই। শত শত বছর ধরে তাই করে আসছে। পাখির কলরবও তাই। কিন্তু মানুষ সঙ্গীতের জগতে অসংখ্য নতুন সুর সৃষ্টি করেছে। এখানেই মানুষ অনন্য। মানুষ যখন স্বনির্ভর থেকে ধীরে ধীরে পরনির্ভর হয়ে যাবে তখন তারা ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যাবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎকর্ষতার সঙ্গে ধ্বংসের অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আলামতও দৃশ্যমান। পৃথিবী থেকে প্রকৃতি নির্ভর অতিকায় হস্তি, ডাইনোসরসহ অনেক পরাক্রমশালী প্রাণী একদিন হারিয়ে গেছে। মানুষও তাঁর সৃজনশীল শক্তি হারালে ওইসব প্রাণীর মতো একদিন বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। হাজার হাজার বছর ধরে বিবর্তনের ইতিহাস অন্তত তাই বলে।

তাই মানুষের টিকে থাকার একমাত্র রহস্য তাঁর অভিনব সৃজনশীল চিন্তাশক্তি। আসুন যন্ত্রনির্ভরতা কমাই (যদিও সময়ের পরিহাস যন্ত্রমাধ্যমেই সে কথাটুকু ব্যক্ত করতে হচ্ছে)।

আলমগীর শাহরিয়ারকবি ও প্রাবন্ধিক

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়