ঢাকা, শুক্রবার   ১৮ জুন ২০২১,   আষাঢ় ৪ ১৪২৮

জসীম উদ্দীন মাসুদ

প্রকাশিত: ১৩:৫৫, ৪ জুন ২০২১
আপডেট: ১৭:৪২, ৫ জুন ২০২১

এ বাজেট করোনাকালেও ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখাতে পারবে?

বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে বড় একটি বাজেটের প্রয়োজন ছিল। করজাল বাড়িয়ে এবং ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ-সব ধরনের শিল্প ও ব্যবসাকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা যোগাতে পারলে এ বাজেট করোনাকালেও ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখাতে পারবে।

২০২০-২০২১ অর্থ বছরের বাজেট উত্থাপনের ৩৫৭ দিন পর চলমান এই করোনাকালীন সময়েই সরকারের দ্বিতীয় বাজেট জাতীয় সংসদে গতকাল বৃহস্পতিবার (৪ জুন) উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। ২০২১-২০২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের শিরোনাম দেয়া হয়েছে ‘জীবন-জীবিকায় প্রাধান্য: সুদৃঢ় আগামীর পথে বাংলাদেশ’, গত অর্থবছরের এই শিরোনাম ছিল ‘অর্থনৈতিক উত্তরণ: ভবিষ্যৎ পথ পরিক্রমা’। ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা, এবার ৩৫ হাজার ৬৮১ হাজার কোটি টাকা বেড়ে এর আকার দাঁড়ালো ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকায়। ১৯২ পৃষ্ঠার এই বাজেট বক্তৃতা ছিল দেশের ইতিহাসে ৫০তম, বর্তমান সরকারের টানা ১৩তম এবং অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের তৃতীয় বাজেট।

বাস্তবতা

করোনাকালীন সময়ে মানুষের আয় কমে গেছে। বেড়েছে নতুন অনেক দরিদ্র মানুষের সংখ্যা। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) বলছে, করোনায় নতুন করে ১ কোটি ৬৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। দারিদ্র্য বেড়েছে, কর্মসংস্থান কমেছে। বাজেটের যে মূল জায়গা রাজস্ব আদায় সেখানে এখনও সমস্যা রয়ে গেছে। সারাবিশ্বে কর জিডিপি হারে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে আছে। বাড়াতে হবে করের আওতা এবং ভ্যাটের বাইরে থাকা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে চিহ্নিত করতে হবে। বরাদ্দ কেন সঠিকভাবে ব্যয় করা যাচ্ছে না সেই কারণগুলোর নিরূপনও জরুরী হয়ে পড়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাত কেন বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যবহার করতে পারছেনা তা সত্যিই ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এক নজরে বাজেটের আদ্যোপান্ত

২০২১-২২ অর্থবছরে প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। যা জিডিপির ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ। অনেকে বলছেন এটি একটি বড় বাজেট। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে বড় বাজেটের প্রয়োজন রয়েছে এবং পৃথিবীর অনেক দেশই তা করেছে। বাজেটে মোট আয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা, চলতি বাজেটে যা ছিল ৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। এই হিসেবে আয় বেড়েছে ১১ হাজার কোটি টাকা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-কে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা আয়ের জন্য। আশ্চর‌্যজনকভাবে চলতি বাজেটের আয়ের সমপরিমাণ লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়েছিল। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বহির্ভূত কর থেকে আসবে ১৬ হাজার কোটি টাকা ও কর ব্যতীত প্রাপ্তি ধরা হয়েছে ৪৩ হাজার কোটি টাকা। বৈদেশিক অনুদান পাওয়ার লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা।

বাজেটে পরিচালনসহ অন্যান্য খাতে মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩ লাখ ৭৮ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ২ লাখ ২৫ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা। বাজেট ঘাটতি ২ লাখ ১৪ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা, যা জিডিপি'র ৬.২ শতাংশ। এই হার গত বাজেটে ছিল ৬.১ শতাংশ। ঘাটতি অর্থায়নে বৈদেশিক উৎস হতে ১ লাখ ১ হাজার ২২৮ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস হতে ১ লাখ ১৩ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা হতে সংগৃহীত হবে ৭৬ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য ব্যাংক-বহির্ভূত খাত হতে আসবে ৩৭ হাজার ১ কোটি টাকা। মহামারীর বাস্তবতায় প্রস্তাবিত বাজেটে দেখা গিয়েছে, গত বছরের চেয়ে কমিয়ে ৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশায় রাশ টেনে ধরা হয়েছে।

শিক্ষা খাত গুরুত্ব পেলেও করোনাকালীন ক্ষতি পোষাতে অপর্যাপ্ত

২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৭১ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাতে বরাদ্দের পরিমাণ ছিল ৬৬ হাজার ২০৭ কোটি টাকা। এ হিসাবে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বেড়েছে ৫ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকা। বাজেটে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে ৪৫ হাজার ৬৩৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের জন্য ৩৬ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের জন্য ৯ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৬ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা খাতে উন্নয়ন বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ২৪ হাজার ৬৫২ কোটি টাকা। এর মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের জন্য উন্নয়ন বরাদ্দ ১৪ হাজার ৩২০ কোটি টাকা, ২ হাজার ৩১০ কোটি টাকা কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের জন্য এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য উন্নয়ন বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৮ হাজার ২২ কোটি টাকা। করোনা মহামারীর কারণে শিক্ষা খাতে যে বিশাল ক্ষতি হয়ে গেছে তা পুনরুদ্ধারে প্রস্তাবিত বরাদ্দ বাজেটের মোট বরাদ্দ ও জিডিপির তুলনায় তা শিক্ষানুরাগীদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।

কৃষিখাত এবারও অগ্রাধিকারের তালিকায়

কৃষকদের জন্যে সুখবর রয়েছে বাজেটে। বেশ কয়েকটি কৃষি উপকরণের ওপর ভ্যাট অব্যাহতির প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। কৃষি খাতের প্রধান উপকরণগুলো বিশেষ করে সার, বীজ, কীটনাশক আমদানিতে শূন্য শুল্কহার অব্যাহত রাখার কথা বলা হয়েছে। স্বল্পমূল্যে কৃষিজাত পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের জন্য কৃষি খাতের আধুনিকায়নের লক্ষ্যে বেশ কয়েকটি পণ্যের উৎপাদন ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়ার পাশাপাশি থ্রেসার মেশিন, পাওয়ার রিপার, পাওয়ার টিলার, অপারেটেড সিডার, কম্বাইন্ড হারভেস্টর, রোটারি টিলারের ওপর আমদানি পর্যায়ে আগাম কর অব্যাহতির প্রস্তাব করা হয়েছে। বলা যায় বাজেটে কৃষি অন্যতম অগ্রাধিকার খাত হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

শুধু বৃহৎ শিল্প নয়, এসএমই-কেও দিতে হবে গুরুত্ব

ধীরে ধীরে করোনার ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছেন বৃহৎ শিল্প উদ্যোক্তারা। কিন্তু এখনও সমস্যার আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও এসএমই উদ্যোক্তারা। গত বছর শুধু তৈরি পোশাক খাতের জন্য আলাদা করে পাঁচ হাজার কোটি টাকার ঋণ প্রণোদনা দিয়েছিল সরকার। বৃহৎ শিল্পের জন্য মোট ঋণের পরিমান ছিল ৪০ হাজার কোটি টাকার। কিন্তু এই স্বস্তি এখনও আসেনি ক্ষুদ্র শিল্পের উদ্যোক্তাদের। তাদের ব্যবসায়ও গতি ফেরেনি এখনও। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা করোনাকালীন প্রণোদনার তালিকায় নেই। কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প খাতের (সিএসএমই) জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ হলেও ব্যাংকসহ নানা জটিলতায় তারা বেশিরভাগই প্রণোদনার ঋণ পায়নি। এসব বিষয়ে অধিকতর মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন ছিল।

স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ প্রায় আগের মতোই

বরাদ্দ বেড়েছে স্বাস্থ্য খাতেও। ২০২১-২২ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে করোনা সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে স্বাস্থ্যখাতে ৩২ হাজার ৭৩১ কোটি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আগের অর্থবছরের স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল ২৯ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের তুলনায় এবার তিন হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া শুধুমাত্র করোনাভাইরাস প্রতিরোধে প্রস্তাবিত বাজেটে থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা। গত অর্থ বছরেও এ বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। গত বছরের বরাদ্দ এখনও ব্যয় করা সম্ভব হয়নি, তবে স্বাস্থ্য গবেষণায়েআগের মতো এবারও ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদে এগিয়ে যাবার আভাস

সরকারের দূরদর্শী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপের কারণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দেশে বিগত ১২ বছরে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়েছে। ২০০৯ সনের তুলনায় বর্তমানে ৫ গুণ বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা (ক্যাপটিভ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ) ২৫ হজার ২২৭ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। বাজেটে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ খাতে ২৭ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এবার বরাদ্দের পরিমাণ বেড়েছে ৭২৬ কোটি টাকা। ৩৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণাধীন রয়েছে এবং ২০টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছে। তাছাড়া ৬টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দরপত্র প্রক্রিয়াধীন এবং ১৫ হাজার ১৯ মেগাওয়াট ক্ষমতার ৩৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিকল্পনাধীন রয়েছে।

সরকারের কঠোর পদক্ষেপের কারণে বিদ্যুতের সিস্টেম লস ১৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ হয়েছে। দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার শতকরা ১০ ভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যে সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন ও বায়ুচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। দেশে আবিস্কৃত ২৭টি গ্যাসক্ষেত্রের মধ্যে বর্তমানে ২০টি উৎপাদনে রয়েছে। কক্সবাজার জেলার মহেশখালীতে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট করে মোট এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট ক্ষমতার দু’টি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন করা হয়েছে।

বাড়ানো হয়েছে সামাজিক নিরাপত্তা খাতের আওতা

অর্থমন্ত্রী এ বছরের বাজেটকে ‘মানুষের জন্য বাজেট’ নামে অভিহিত করেছেন এবং আগামী অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে আওতা বাড়ানোর প্রস্তাব করেছেন। চলতি অর্থবছরে সর্বাধিক দারিদ্রপ্রবণ ১১২টি উপজেলায় শতভাগ ‘বয়স্ক ভাতার’ কর্মসূচি এবার ১৫০টি উপজেলায় সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। এতে করে ৮ লাখ নতুন উপকারভোগী যোগ হবে এবং এই ১৫০টি ইপজেলায় বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা মহিলাকে শতভাগ বিধবা, স্বামী নিগৃহীতা মহিলাদের জন্য ভাতা কার্যক্রম এর আওতায় আনায় ৪ লক্ষ ২৫ হাজার জন নতুন উপকারভোগী যোগ হবে। এ বছর অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতা ভোগীর সংখ্যা ২ লক্ষ ৮ হাজার জন বৃদ্ধি পাবে। যার ফলে, ২০২১-২০২২ অর্থবছরে এ বাবদ ২০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দের প্রয়োজন হবে। সবমিলিয়ে ২০২১-২০২২ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে মোট ১ লক্ষ ৭ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা বাজেটের ১৭.৮৩ শতাংশ এবং জিডিপির ৩.১১ শতাংশ। ২০২০-২০২১ অর্থবছরে যা ছিল ৯৫ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা।

ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুফল আনবে কারিগরি শিক্ষা

কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার লক্ষ্যে বাজেটে বিশেষ কর সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবে কিছু নির্দিষ্ট খাতে কারিগরি প্রশিক্ষণদাতা প্রতিষ্ঠানকে ১০ বছরের জন্য কর অব্যাহতি সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে ব্যাপকভিত্তিক উচ্চমানের কারিগরী প্রশিক্ষন প্রতিষ্ঠানের ঘাটতি থাকায় বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুফল পুরোপুরিভাবে ভোগ করতে পারছে না। এজন্যে পেশাগত প্রশিক্ষন প্রদানে স্থাপিত প্রতিষ্ঠানসমূহকে শর্ত সাপেক্ষে দশ বছরের জন্য কর অব্যাহতি সুবিধা প্রদানের প্রস্তাব করা হয়েছে যাতে দেশের শিল্পায়নে নতুন দিগন্ত উম্মোচিত হয়।

এগিয়ে যাক নারী উদ্যোক্তারা

দেশে নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে নারী উদ্যোক্তারদেরকে দেওয়া কর-সুবিধা আরও বাড়ছে। নারী উদ্যোক্তাদের করমুক্ত আয়ের সীমা ৫০ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ লাখ টাকায় উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে। এর ফলে নারী উদ্যোক্তারাদের বছরে ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ে কোনো কর দিতে হবে না। এসব উদ্যোগের কারণে অর্থনীতিতে উদ্যোক্তা হিসেবে পুরুষের পাশাপাশি নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা বাড়ছে। এভাবে নারীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হবে।

তৃতীয় লিঙ্গের মানুষকে মূলধারায় আনার প্রচেষ্টা

তৃতীয় লিঙ্গের মানুষকে চাকরি দিলে বিশেষ কর ছাড়ের প্রস্তাব করা হয়েছে বাজেটে। যদি কোনো প্রতিষ্ঠান তার মোট কর্মচারীর ১০ শতাংশ বা ১০০ জনের অধিক তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়, তবে ওই কর্মচারীদের পরিশোধিত বেতনের ৭৫ শতাংশ বা প্রদেয় করের ৫ শতাংশ, যেটি কম, তা নিয়োগকারীকে কর রেয়াত হিসেবে প্রদানের জন্য প্রয়োজনীয় বিধান সংযোজনের প্রস্তাব করা হয়েছে বাজেটে। এছাড়া দেশের প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে সামাজিক এবং অর্থনীতির মূলধারায় আনতে বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে বাজেটে। এত দিন সবার মতো তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের করমুক্ত আয়সীমা ছিল তিন লাখ টাকা। এখন এটা বাড়িয়ে সাড়ে তিন লাখ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী এবং তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের সমাজের মূলধারায় নিয়ে আসার জন্যে এই প্রস্তাব নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী হয়েছে।

সুদের ব্যয় এবারও আকাশচুম্বী

সুদ পরিশোধ খাতে সরকারের ব্যয় বেড়েই চলেছে। বৈদেশিক অনুদানের পরিমাণ কমতে থাকায় গুরুত্ব বাড়ছে বৈদেশিক ঋণ ও অভ্যন্তরীন ঋণের উপর। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের গতি অব্যাহত রাখতে বাড়ছে ঋণের পরিমাণ। একই সঙ্গে বাড়ছে এসব ঋণের সুদ খাতের ব্যয়। আগামী অর্থবছরের (২০২১-২২) অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি খরচ হবে ঋণের সুদ পরিশোধে, যার পরিমাণ ৬৮ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা। এটি মোট বাজেটে প্রস্তাবিত ব্যয়ের ১১.৩৬ শতাংশ।

কর্মসংস্থান হবে আরও ১০ লাখ তরুণ-তরুণীর

ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য অর্জনে তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) খাতে এরই মধ্যে ১০ লাখ তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হয়েছে। ২০২১ সালের মধ্যে আরও ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে বাজেটে। বলা হয়েছে, দেশের জনসংখ্যার ৫০ শতাংশের বেশি তরুণ, যার হার উন্নত বিশ্বে ২০ থেকে ২৫ শতাংশের বেশি নয়। এ ছাড়া প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখের বেশি মানুষ দেশের শ্রমবাজারে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। অন্যদিকে চলমান চতুর্থ শিল্পবিপ্লব দেশে-বিদেশে দক্ষ জনশক্তির জন্য নতুন নতুন কর্মসংস্থানের অভূতপূর্ব দ্বার উন্মোচন করেছে। পাশাপাশি ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা’ ভিশন ২০৪১ এবং ডেল্টা প্ল্যান ২১০০’–এর বাস্তবায়ন কার্যক্রম দেশে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও কারিগরি জ্ঞানে পারদর্শী মানুষের বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

আরও কিছু উদ্যোগ

  • বাজেটে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা ১২ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে বাজাটে ২০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
  • ব্যবসায়ীদের দাবিতে সাড়া দিয়ে এবারও করপোরেট কর হারে ছাড় দেয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে উৎপাদনমুখী শিল্পখাতের করহার ২ দশমিক ৫০ শতাংশ কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
  • করোনার কারণে তৈরি হওয়া বিরূপ পরিস্থিতিতে বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে নতুন করে প্রণোদনার ঋণের আবেদনে সাড়া দেয়নি সরকার। এ খাতে রফতানি প্রণোদনা ১ শতাংশ অব্যাহত থাকছে। বিগত অর্থবছরেরও এ খাতে এই ১ শতাংশ প্রণোদনা ছিল।
  • বাজেটে সিমেন্ট উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে করহার ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
  • বাজেট ঘোষণায় বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারি সত্ত্বেও গত বছর ২ লাখ ১৭ হাজার ৬৬৯ জন বাংলাদেশি কর্মীর বৈদেশিক কর্মসংস্থান হয়েছে।
  • আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম দিন থেকে দুই লাখ টাকার কম অর্থের সঞ্চয়পত্র কিনতে ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার (টিআইএন) সার্টিফিকেট লাগবে না। বর্তমানে ৫০ হাজার টাকার অধিক অর্থের সঞ্চয়পত্র কিনতে টিআইএন সার্টিফিকেট জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা
  • প্রবাসী আয় বাড়াতে বাজেটে ২ শতাংশ হারে নগদ প্রণোদনার ব্যবস্থা আগের মতো বহাল রয়েছে। কোভিড মহামারীতেও এমন প্রণোদনা দেশকে প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে স্বস্তিতে রেখেছিল। তবে অনেকেই মনে করেন প্রবাস থেকে অর্থ পাঠানোর প্রক্রিয়া আরও সহজীকরণের কথা ভাবতে হবে।
  • করমুক্ত আয়সীমাও রয়ে গেছে আগের মতো অর্থাৎ যাদের বার্ষিক আয় ৩ লাখ টাকার কম, তাদেরকে কোন কর দিতে হবে না।

শেষ কথা

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস অতিমারির কারণে সারাবিশ্বের মতো কঠিন সময় পার করছে বাংলাদেশ। ভীষণ সংকটে রয়েছে মানুষের জীবন ও জীবিকা। তারপরও একদম আশাহত করেনি আমাদের অর্থনীতি। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে আমাদের মাথাপিছু আয় ছিল ৫৪৩ মার্কিন ডলার, যা বর্তমানে ২ হাজার ২২৭ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। ওই সময়ে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪১ দশমিক ৫ শতাংশ, বর্তমানে দারিদ্র্যের হার কমে দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ৫ শতাংশ। জিডিপির আকার ৪ লাখ ৮২ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকা থেকে ২৮ লাখ কোটি টাকা হয়েছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বাজেটের আকার ছিল ৬১ হাজার কোটি টাকা, যা বর্তমান অর্থবছরে দশগুণের মতো বৃদ্ধি পেয়েছে। শিশুমৃত্যু হার কমে প্রতি হাজারে ৮৪ থেকে ২৮ এবং মাতৃমৃত্যু হার প্রতি লাখে ৩৭০ থেকে কমে ১৬৫ জনে দাঁড়িয়েছে। এসব সংবাদ আমাদের এগিয়ে যাবার ক্ষেত্রে অনেক আশাবাদী করে তোলে। বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে বড় একটি বাজেট করতে হয়েছে। করজাল বাড়িয়ে সঠিকভাবে আদায়ের মাধ্যমে এবং ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ-সব ধরনের শিল্প ও ব্যবসাকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা যোগাতে পারলে এ বাজেট করোনাকালেও ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখাতে পারে আমাদের।

জসীম উদ্দীন মাসুদ, উন্নয়ন গবেষক

  • খোলা জানালা বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। eyenews.news-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে eyenews.news আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।
Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়