ঢাকা, শুক্রবার   ২২ অক্টোবর ২০২১,   কার্তিক ৬ ১৪২৮

ইমতিয়াজ মাহমুদ

প্রকাশিত: ২৩:১৩, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১
আপডেট: ২৩:৩৫, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১

তালেবানরা মেয়েদের খেলতে না দিলে ওই দেশের সাথে খেলা বন্ধ করা হোক

অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট বোর্ডের নাম ‘'ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া’। অন্যান্য ক্রিকেট বোর্ডরাও অনেকে একে একে এই কায়দা করেছে। কিন্তু সেটা আমার কাছে এতটা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি, এগুলো তো নিতান্ত মার্কেটিংয়ের নানান কায়দার একটা।

কিন্তু আফগানিস্তানের সাথে সিরিজটা নিয়ে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া যেটা করেছে সেটা আমার ভাল লেগেছে, যথাযথ মনে হয়েছে, ক্রিকেটের চেতনার সাথে তথা ক্রীড়ার চেতনার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ মনে হয়েছে। আমি মনে করি সকল টেস্ট প্লেয়িং দেশ এবং আইসিসি সকলে মিলে একইরকম সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া তো ঠিক কাজটাই করেছে, আইসিসিরও উচিৎ হবে এরকম একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া।

তালেবানরা যদি আফগান মেয়েদেরকে ক্রিকেট খেলতে না দেয়, বা অন্যসব খেলাধুলায় অংশ নিতে বাধা দেয়, তাইলে দুনিয়ার কোনোও দেশের উচিৎ হবে না ওদের সাথে একসাথে কোন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বা অন্য কোন খেলায় অংশ নেওয়া। ক্রিকেটের কথাই যখন উঠেছে, তখন ক্রিকেটের কথাই বলি- আফগানিস্তানের পুরুষ ক্রিকেট দলের সাথে সকলে দেশের সকল সিরিজ বন্ধ করে দেওয়া হোক।

খেলাধুলা হচ্ছে মানুষে মানুষে সম্প্রীতি, মৈত্রী ও সদাচারের একটা ক্ষেত্র। আর খেলাধুলার মধ্যে ক্রিকেট তো হচ্ছে খেলার রাজা- ভদ্রলোকের দলগত খেলা। অতি শোভন ও সুশীল একটা ক্রীড়া হচ্ছে ক্রিকেট। যে দেশ মানুষে মানুষে বৈষম্য করবে, যে জাতি গায়ের বর্ণের কারণে, বা ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিন্নতার কারণে বা লৈঙ্গিক ভিন্নতার কারণে দেশের জনগণের একটি অংশকে ক্রিকেট খেলা থেকে গায়ের জোরে বাইরে রাখতে চাইবে, সেই জাতির পতাকা ক্রিকেট মাঠে উড়তে পারে না। কোন দেশ যদি বলে কালো গায়ের রঙ হলে ক্রিকেট খেলটা পারবে না অথবা যদি বলে খৃস্টান না হলে ক্রিকেট খেলতে পারবে না ওদের সাথে আমরা খেলব? না, খেলব না। তাইলে যারা বলে যে নারী হলে ক্রিকেট খেলতে পারবে না, ওদের সাথে কেন আমরা খেলব?

আফগানিস্তানের পুরুষ ক্রিকেট দলকে এখুনি বয়কট করা দরকার। যতদিন না ওরা ওদের নারীদের উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে না নেবে, এই বয়কট অব্যাহত রাখতে হবে। এইটা তো নতুন কোন বিষয় না। অপেক্ষাকৃত তরুণ যারা, আপনাদের হয়তো মনে নাও থাকতে পারে- বর্ণবাদের কারণে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ক্রিকেট দুনিয়া থেকে বয়কট করা হয়েছিল ১৯৭০ থেকে ১৯৯১ সন পর্যন্ত। দক্ষিণ আফ্রিকার দোষ কি ছিল? ওরা নিয়ম করেছিল যে ওদের দেশের টিমে শ্বেতাঙ্গ ছাড়া অন্য কোন রঙের খেলোয়াড় অংশ নিতে পারবে না। এটা নিয়ে ক্রিকেট দুনিয়ায় সমালোচনা ছিল, কিন্তু সমালোচনাটা সমালোচনাতেই সীমাবদ্ধ ছিল, সবাই খেলে যাচ্ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে।

যে সময়টা দক্ষিণ আফ্রিকাকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বের করে দেওয়া হয়, সেই সময় দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট টিম ছিল শীর্ষস্থানীয় টেস্ট টিম। গ্রায়েম পলক, ব্যারি রিচার্ডস, মাইক প্রোক্টর এরা তখন দক্ষিণ আফ্রিকা দলের ক্রিকেটার। আপনি যদি ক্রিকেট সংক্রান্ত কোন বই বা পরিসংখ্যান খুলে দেখেন, তাইলেই বুঝতে পারবেন এরা কীরকম একেকজন খেলোয়াড় ছিলেন। সকলেই চাইত দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে খেলতে। কিন্তু যে সংকটটা মনের ভিতরে পুষছিল সকলেই সেটা বেরিয়ে এলো বাসিল ডি'অলিভেরাকে ইংল্যান্ড দলে অন্তর্ভুক্ত করার প্রশ্নে।

বাসিল ডি'অলিভেরা ছিলেন ইন্ডিয়ান আর পর্তুগিজ বাবা মায়ের মিশ্রবর্ণের সন্তান। চমৎকার ব্যাটসম্যান। কিন্তু মিশ্রবর্ণের বলে দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে তার খেলার অধিকার ছিল না। সে বেচারা দক্ষিণ আফ্রিকা ছেড়ে চলে গেছে ইংল্যান্ড। ইংল্যান্ডে কাউন্টি খেলে, এই দলের সেই দলের হয়ে সেঞ্চুরি হাঁকায়। ইংল্যান্ডের নাগরিকত্বও গ্রহণ করে সে। কিন্তু ভাল খেললেও দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে তাকে দলে নেওয়া হয় না। কেননা, দক্ষিণ আফ্রিকা বলে দিয়েছে ওকে দলে নিলে আমরা তোমাদের সাথে খেলব না। একটা খেলোয়াড় একের পর এক সেঞ্চুরি হাঁকাচ্ছে ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে তাকে আপনি কতদিন দলে না নিয়ে পারবেন। ইংল্যান্ড দল ওকে দলে নিয়েছে, দখন আফ্রিকার ক্রিকেট বোর্ড বাগড়া দেওয়ার চেষ্টা করেছে। ক্রিকেট দুনিয়া বলেছে এটা অন্যায়। খেলোয়াড়দের মধ্যে গায়ের রঙ বা বর্ণের কারণে বৈষম্য কেন করবে? বয়কট।

দক্ষিণ আফ্রিকাকে বয়কট করা সোজা কাজ ছিল না। ওরা তখন ক্রিকেটের পেছনে অনেক টাকা খরচ করতো। অন্যান্য টেস্ট প্লেয়িং দেশ থেকে বিদ্রোহী দল বানিয়ে ক্রিকেটারদের অনেকে ওখানে গিয়ে অনানুষ্ঠানিক টেস্ট ক্রিকেট খেলত। ইংল্যান্ড থেকে অস্ট্রেলিয়া থেকে এইরকম দল যেতো। এরকম খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেয়া হতো। গ্রাহাম গুচ এইরকম দল নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা গিয়েছিলেন বলে অনেকদিন ইংল্যান্ড দলে খেলতে পারেননি। ওয়েস্ট ইন্ডিজেরও কয়েকজন খেলোয়াড় বর্ণবাদী দক্ষিণ আফ্রিকা খেলতে গিয়েছিল। কিন্তু আইসিসির আরোপিত বয়কট ঠিকই চলছিল।

ক্রিকেট দুনিয়া বেশ কয়েকজন চমৎকার সব খেলোয়াড়ের খেলা থেকে বঞ্চিত হয়েছে এই বয়কটের কারণে। ক্লাইভ রাইস ছিলেন সেরকম একজন খেলোয়াড়। ইয়ান বোথাম, ইমরান খান, কপিল দেব আর রিচার্ড হ্যাডলি যখন টেস্ট দুনিয়ার চার শীর্ষ অলরাউন্ডার সেই সময় ক্লাইভ রাইস ছিলেন আরেকজন ওইরকম খেলোয়াড়। সকলেই মনে করেন সেসময় দখন আফ্রিকা যদি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলতে পারতো তাইলে ক্লাইভ রাইস অন্য চারজনের চেয়ে বড় কীর্তি গড়তে পারতেন। অ্যালান ডোনাল্ড এই বয়কটের কারণে ১৯৯২-এর আগে টেস্ট খেলার সুযোগ পাননি। ১৯৯২-তে ছাব্বিশ বছর বয়সে তিনি প্রথম টেস্ট খেলতে নামেন। ক্যারিয়ার শেষ করেছেন ৩৩০ উইকেট নিয়ে। পাঁচ বছর আগে ডোনাল্ড যখন সেরা ফর্মে ছিল তখন থেকে খেলতে পারলে ওর কীর্তিটা কীরকম হতে পারতো অনুমান করেন।

তবুও বয়কটটা বিদ্যমান ছিল। কেননা বৈষম্য যারা করে ওদের পতাকা আপনি ক্রিকেট মাঠে ওড়াতে দিতে পারেন না। সকলেই এই একটা কথাতে একমত ছিল, ক্রিকেটের পবিত্র মাঠে বৈষম্যকারীর কোন স্থান হতে পারে না।

বৈষম্য মানে কী? কেবল বর্ণবাদ মানেই তো বৈষম্য নয়। গায়ের রঙের জন্যে বৈষম্য যেমন মন্দ, লিঙ্গের ভিত্তিতে বৈষম্য করা সেটা আরও মন্দ। সাদা ছাড়া অন্যরা ক্রিকেট খেলতে পারবে না সেটা যেমন বৈষম্য, মেয়ে বলেই কেউ ক্রিকেট খেলতে পারবে না সেটাও বৈষম্য। লিঙ্গের ভিত্তিতে বৈষম্য বরং আরও ঘৃণ্য বৈষম্য। বর্ণবাদী বৈষম্যের কারণে যেমন শাস্তি হওয়া দরকার, লৈঙ্গিক বৈষম্যের কারণেও শাস্তি হওয়া দরকার। না, ধর্মীয় সেন্টিমেন্ট বা ধর্মীয় বিধিনিষেধ সেটা সম্পর্কে আমি ওয়াকেফহাল আছি। কোন নারী যদি নিজের ব্যক্তিগত ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে ক্রিকেট খেলতে না চায় তাকে তো বলার কিছু নাই, তিনি খেলবেন না। কিন্তু যেসব নারী ক্রিকেট খেলতে চান, তাদেরকে কেন খেলতে দেওয়া হবে না।

একজন পুরুষের যেমন অধিকার আছে দেশের হয়ে খেলাধুলায় অংশ নেওয়ার, একজন নারীরও তো সেই অধিকার আছে। শুধু নারী বলে ওদেরকে খেলতে না দেওয়া সে তো অন্যায়। ক্রিকেট দুনিয়ার সকলেরই উচিৎ এই মুহূর্তে তালেবানদের জানিয়ে দেওয়া আফগান নারীদেরকে যদি ক্রিকেট খেলতে দেওয়া না হয়, তাইলে আফগান পুরুষ ক্রিকেট দলের সাথেও অন্য কোন দেশ খেলবে না। খেলার মাঠে বৈষম্য সহ্য করা হবে না।

  ইমতিয়াজ মাহমুদ, অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

  • খোলা জানালা বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। eyenews.news-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে eyenews.news আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।
Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়