ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০৭ জুলাই ২০২২,   আষাঢ় ২৩ ১৪২৯

জেসমিন চৌধুরী

প্রকাশিত: ২২:০০, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২২
আপডেট: ২৩:২০, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২২

আমি কি কেবলই ভাবী?

জেসমিন চৌধুরী

জেসমিন চৌধুরী

‘আপা, আমরা তো হাউসওয়াইফ। যারা চাকরি করে তাদেরকে সবাই আপা ডাকে। আমরা হ‌ইলাম ভাবী, আমাদের কোনো দাম নাই কারো কাছে।’

এবার এয়ারপোর্টে নামার পর‌ই এক অপরিচিত মহিলার সাথে আলাপ হলো। একটু পরেই তিনি বললেন, ‘পরিচিত হয়ে খুশি হলাম ভাবী।’ 

আমার প্রশ্ন, ‘আপনি আমার স্বামীকে চেনেন, জানতাম না তো!’

‘উনাকে চিনব কেমন করে? আপনার সাথেই তো মাত্র পরিচয় হলো।’

‘তাহলে আমি আপনার ভাবী হলাম কেমন করে?’

‘তাহলে আপনাকে কী ডাকব?’

‘আমার নাম জেসমিন।’

‘পরিচয় হ‌ওয়া মাত্র তো নাম ধরে ডাকা যায় না।’

‘তাহলে আপা ডাকুন। অপরিচিত একজন পুরুষকে অনর্থক গুরুত্ব দিচ্ছেন কেন?’

গত পরশু পার্লারে চুলে রং করাচ্ছিলাম। দুই মহিলা এসে ঢুকলেন। তাদের মধ্যে একজন যে মেয়েটা রং লাগাচ্ছিল তাকে আমার হেয়ার ডাই সম্পর্কে প্রশ্ন করতে শুরু করলেন,

‘এটা কোন ব্র্যান্ড? দাম কত?’

 মেয়েটা বলল, ‘আমি জানি না। আপা বাইরে থেকে নিয়ে এসেছেন।’ 

মহিলা তখন আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

‘ভাবী এই রং এর নাম কী?’

আমি বোধহয় কিছুটা ক্ষেপেই গেলাম, ‘তার আগে বলুন আমি কীভাবে আপনার ভাবী হ‌ই?’

দুই মহিলা বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে একজন আরেকজনের দিকে তাকালেন। 

আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম,

‘আপনারা দুজন কি বন্ধু?’

‘নাহ, ঠিক বন্ধু না। বাচ্চারা এক‌ই স্কুলে পড়ে, তাই রোজ দেখা হয়। ওদেরকে স্কুলে দিয়ে মাঝে মধ্যে আমরা পার্লারে আসি।’

‘পরস্পরকে কী ডাকেন?’

আবার চোখাচোখি। 

‘ঐ তো! ভাবীই ডাকি।’

‘পরস্পরের স্বামীকে চেনেন?’

আবার চোখাচোখি, সেইসাথে হাসাহাসি। 

‘নাহ। উনাদেরকে চিনব কেমন করে? উনারা তো স্কুলে আসে না।’

‘তো, ভাইদের সাথে পরিচয় ছাড়াই বৌরা সব ভাবী হয়ে গেছেন? আপনারা পরস্পরের নাম জানেন না?’

আবার হাসাহাসি, তবে মনে হলো নাম না জানার জন্য কিছুটা বিব্রত। এবং আমার বাচালতায় অনেকটা মুগ্ধ,

‘ইস ভাবী, আপনি কী সুন্দর করে কথা বলেন!’

‘আবার ভাবী!’

‘অভ্যাস হয়ে গেছে যে!’

‘অভ্যাসটা বদলান। নিজের এবং অন্য নারীদের অস্তিত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন। আপনাদের স্বামীরা কিন্তু তাদের পরিচিত পুরুষদের নাম জানেন, অপরিচিতদেরকে ভাই বলে ডাকেন। পুরুষরা আপনাদের মতো পরস্পরকে দুলাভাই ডাকে না।’ 

‘ও মা! দুলাভাই কেন ডাকবে? এ কেমন কথা?’

‘আপনারা যদি পৃথিবীর সব নারীকে ভাবী ডাকেন, তাহলে সব পুরুষকে দুলাভাই ডাকবেন না কেন? পুরুষদের নিজেদের পরিচয়ের মূল্য আছে, আমাদের নেই?’

পার্লারের মেয়েটা বলল, ‘আমাদের আপা কিন্তু লেখিকা। এইসব লেখাই উনার কাজ।’ 

এ কথা শুনে আমার প্রতি তাদের আগ্রহ যেন বেড়ে গেল। আরো মনোযোগ দিয়ে আমার কথাগুলো শুনতে শুরু করলেন। এয়ারপোর্টের মহিলাকে দেয়া বক্তৃতাটা ইনাদেরকেও দিলাম। ঐ মহিলার মতো ইনারাও সহজেই আমার কথা বুঝতে পারলেন এবং সহমতের পাশাপাশি নিজে কখনো এমন করে ভাবতে পারেননি বলে দুঃখ প্রকাশ করলেন। 

‘আপা, আমরা তো হাউসওয়াইফ। যারা চাকরি করে তাদেরকে সবাই আপা ডাকে। আমরা হ‌ইলাম ভাবী, আমাদের কোনো দাম নাই কারো কাছে।’

‘নিজের দামটা নিজেকে আগে বুঝতে হবে। আপনারা গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিয়োজিত আছেন। দেশের ভবিষ্যত নাগরিকদের গড়ে তুলছেন আপনারা। সেটা মাথায় রাখবেন। স্কুলের গেইটে বসে ভাবী ভাবী করা ছাড়াও আরো অনেক দায়িত্ব আছে আপনাদের।’ 

বলা বাহুল্য আমার কথা শুনে উনাদের পৃথিবীর রং যেন মুহূর্তেই বদলে গেল। চোখে নতুন ভাবনার ঝিলিক দেখলাম মনে হলো।

বেরিয়ে আসতে আসতে ভাবলাম, যে দেশের শিক্ষিত নারীদের একটা বিরাট অংশের ভাবনার জগতকে‌ এতোটাই অসাড় করে রাখা হয়েছে, সেই দেশে পশ্চিমা দেশের নারীবাদের কপি পেস্ট চর্চা কোনো সুফল বয়ে আনবে না। আমাদের গোড়ার গলদগুলো আগে ঠিক করতে হবে।

জেসমিন চৌধুরী, যুক্তরাজ্য প্রবাসী লেখক

 

আই নিউজ ভিডিও

ঐতিহ্যবাহি আদিবাসি সাঁওতাল নৃত্য

গ্রিসের বস্তিতে বাংলাদেশীদের মানবেতর জীবন, অধিকাংশই সিলেটি

ঘোড়দৌড় : সিলেট বিভাগের সব তেজি ঘোড়া এসেছিল এই মাঠে

Green Tea
সোশ্যাল মিডিয়া বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
সর্বশেষ
জনপ্রিয়