ঢাকা, মঙ্গলবার   ০৯ মার্চ ২০২১,   ফাল্গুন ২৫ ১৪২৭

জিএম ইমরান

প্রকাশিত: ২২:০০, ৬ অক্টোবর ২০২০
আপডেট: ০১:৩০, ৭ অক্টোবর ২০২০

নোয়াখালীতে ৬০ মাসে পঞ্চাশের অধিক নারী ধর্ষণ

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

করোনা মহামারির মতো দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে ধর্ষণের মত বিভৎস কর্মকান্ড। ধর্ষকের লোলুপ দৃষ্টি থেকে রেহাই পাচ্ছে না তিন বছর বয়সী শিশু কিংবা সত্তর বছর বয়সী বৃদ্ধা। ঘরের মধ্যে থেকেও নিরাপদ নেই নারী। শুধু তাই নয়, ধর্ষণ শেষে করা হয় নির্মম নির্যাতন, এমনকি চলন্ত বাস থেকে ফেলে দিয়ে হত্যার ঘটনাও ঘটছে। মানুষ নামধারীরা এসব নরপশুরা বর্তমানের একবিংশ শতাব্দীকে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে অন্ধকার বর্বর যুগে।   

এখানকার মানুষগুলো অনেকবেশী আবেগপ্রবণ। ফলে, কোন ছেলে যদি কোন মেয়েকে প্রেমের কিংবা অনৈতিক কাজের প্রস্তাব দেয়। আর মেয়েটি যদি তার প্রস্তাব প্রত্যাখান করে।  তাহলে দেখা যায় ছেলেটি তার প্রতি প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠেছে। একারণে, এখানে নারী নির্যাতন ও সহিংসতার প্রবণতা অনেক বেশী।

দিনকে দিন দেশব্যাপী আলোচিত ধর্ষণ ঘটনা বেড়েই চলছে। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এবং সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী দেশব্যাপী গত পাঁচ বছরে নারী ধর্ষণ ও ধর্ষণ চেষ্টার একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরা হলো-

২০১৫ সালে মোট ধর্ষণ ৮৪৬টি। এর মধ্যে একক ধর্ষণের সংখ্যা ৪৮৪টি, গণধর্ষণ ২৪৫, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা ৬০, ধর্ষণের পরে আত্মহত্যা ২ আর ধর্ষণ চেষ্টা ৯৪টি। 

২০১৬ সালে মোট ধর্ষণ ৭২৪টি। এর মধ্যে একক ধর্ষণের সংখ্যা ৪৪৪টি, গণধর্ষণ ১৯৭, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা ৩৭, ধর্ষণের পরে আত্মহত্যা ৮ আর ধর্ষণ চেষ্টা ৬৫টি। 

২০১৭ সালে মোট ধর্ষণ ৮১৮টি। এর মধ্যে একক ধর্ষণের সংখ্যা ৫৯০টি, গণধর্ষণ ২০৬, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা ৪৭, ধর্ষণের পরে আত্মহত্যা ১১ আর ধর্ষণ চেষ্টা ১০৪টি। 

২০১৮ সালে মোট ধর্ষণ ৭৩২টি। এর মধ্যে একক ধর্ষণের সংখ্যা ৫০২টি, গণধর্ষণ ২০৩, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা ৬৩, ধর্ষণের পরে আত্মহত্যা ৭ আর ধর্ষণ চেষ্টা ১০৩টি।

২০১৯ সালে ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৪১৩ নারী। এর মধ্যে ধর্ষণ পরবর্তী হত্যার শিকার হয়েছেন ৭৬ জন এবং ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছেন ১০ জন।

এবং, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত গত আট মাসে দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৮৮৯ জন নারী । তারমধ্যে ধর্ষণের পর মারা যান ৪১ জন নারী । এবং ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর আত্মহত্যা করেন ৯ জন নারী । এছাড়া, ১৯২ জন নারীকে ধর্ষণ চেষ্টা করা হয়।

দেশব্যাপী ধর্ষণ প্রবণতা বৃদ্ধির কারণ

বিশ্লেষকরা বলছেন, ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে চরম নৈতিক অবক্ষয়, আকাশ সংস্কৃতির বিরূপ প্রভাব, মাদকের বিস্তার, বিচারহীনতা, বিচার প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধকতা ও বিচারের দীর্ঘসূত্রতা।

তবে, দেশব্যাপী ক্রমবর্ধমান ধর্ষণ ঘটনার সাথে মিল রেখে দেশের অন্যতম দ্বীপ জেলা নোয়াখালীতে ধর্ষণ ও ধর্ষণ ঘটনা বেড়েই চলছে। কালবৈশাখীতে অশান্ত সাগরের ঢেউয়ের ন্যায় ধর্ষণ তরঙ্গও যেন আছড়ে পড়ছে সাগরপাড়ের জেলাটির উপর। বিগত কয়েক বছরের ধর্ষণ ঘটনার পরিসংখ্যান দেখলেই তেমন চিত্রই দেখা যায়। 

নোয়াখালীর গত পাঁচ বছরে নারী ধর্ষণ ও ধর্ষণ চেষ্টা

বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তি আইনিউজের এক হিসাব অনুযায়ী, নোয়াখালী জেলায়,  ২০১৫ সালে ধর্ষণ ও ধর্ষণ চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে ৪টি, ২০১৬ সালে ধর্ষণ ও ধর্ষণ চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে ৫ টি, ২০১৭ সালে ধর্ষণ ও ধর্ষণ চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে ৪টি, ২০১৮ সালে ধর্ষণ ও ধর্ষণ চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে ৩টি, ২০১৯ সালে ধর্ষণ ও ধর্ষণ চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে ২৮টি এবং চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত ধর্ষণ ও ধর্ষণ চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে ৮টি।

নোয়াখালী জেলার উল্লেখযোগ্য ধর্ষণ ঘটনা

২০১৫ সালের ২ অক্টোবরে নোয়াখালীর সদর উপজেলায় ‘স্বামীকে জিম্মি করে গৃহবধূকে ধর্ষণ চেষ্টা’, ২০১৬ সালের ২০ জুনে নোয়াখালীর সদর উপজেলায় ‘তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী ধর্ষণের শিকার’, ২০১৭ সালের ২৮ মে নোয়াখালীর সেনবাগে ‘স্বামীকে গাছে বেঁধে স্ত্রীকে পালাক্রমে ধর্ষণ’, একই বছরের ২০ ডিসেম্বর নোয়াখালীর ‘চৌমুহনীতে প্রতিবন্ধী শিশুকে ধর্ষণ’, ২০১৮ সালের ২৮ জুলাই নোয়াখালীর সেনবাগে এক শিশুছাত্রীকে ‘বাড়ির উঠান তুলে নিয়ে শিশুকে ধর্ষণ’, ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি নোয়াখালীর সুবর্ণচর ‘ভোটকেন্দ্রে তর্কাতর্কির জেরে গৃহবধূকে গণধর্ষণ’, ২০১৯ সালের  ১৯ জানুয়ারি ২০১৯ নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলায় ‘তিন সন্তানের জননীকে গণধর্ষণ’ এবং সর্বশেষ নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে ‘গৃহবধূকে বিবস্ত্র করে পাশবিক নির্যাতন’।

নোয়াখালীতে কেন এত ধর্ষণ? 

বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে নোয়খালী অঞ্চলে ধর্ষণ প্রবণতা বৃদ্ধির কারণ হিসেবে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক বাদশা মিয়া অঞ্চলটির ভৌগলিক অবস্থানটিকে দায়ী করেন। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সন্ধ্যায় আইনিউজকে তিনি বলেন, নোয়াখালী জেলার অধিকাংশই চরাঞ্চল। এখানকার মানুষগুলো অনেকবেশী আবেগপ্রবণ। ফলে, কোন ছেলে যদি কোন মেয়েকে প্রেমের কিংবা অনৈতিক কাজের প্রস্তাব দেয়। আর মেয়েটি যদি তার প্রস্তাব প্রত্যাখান করে।  তাহলে দেখা যায় ছেলেটি তার প্রতি প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠেছে। একারণে, এখানে নারী নির্যাতন ও সহিংসতার প্রবণতা অনেক বেশী।  

রাজনৈতিক অবক্ষয়কে দোষারোপ

ভৌগলিক অবস্থানের পাশাপাশি এ ধরণের ঘটনার জন্য এ অঞ্চলের রাজনৈতিক অবক্ষয়কেও দায়ী করেন সহকারী অধ্যাপক বাদশা মিয়া। আইনিউজকে তিনি বলেন, ক্ষমতাসীন কিংবা বিরোধীদলীয় হোক, প্রত্যেক দলের নেতারা তাদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য এক বিশাল কর্মী বাহিনী গড়ে তোলেন। আর এসকল কর্মীরা যতই অন্যায় করুক না কেন, তারা দলের উচ্চ পর্যায়ের প্রশ্রয়ে আরো বেশী অপরাধ প্রবণ হয়ে ওঠে। সুতরাং. আমি বলবো, রাজনৈতিক অবক্ষয়ও এ অঞ্চলের ধর্ষণ ঘটনার মতো অপরাধ বৃদ্ধির জন্য অনেকবেশী দায়ী।

ধর্ষণ যন্ত্রণার তীব্রতা

ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর একজন নারী যে কতটুকু মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যেতে পারে তা আমরা নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলায় ধর্ষণের শিকার গৃহবধূ পলি আক্তারের দিকে তাকালেই বুঝতে পারি।

গত ২০১৯ সালের ২ মার্চ (শুক্রবার) রাতে মাকছুমুল গ্রামের বসত ঘরে ঢুকে গৃহবধূ পলি আক্তারকে ধর্ষণ করে একই গ্রামের আলাউদ্দিন। ধর্ষককে হাতেনাতে ধরার পরও সঠিক বিচার না পেয়ে লোকলজ্জার ভয়ে একই বছরের ৩ মার্চ (শনিবার) সকাল ৮টার দিকে বিষ পান করে আত্মহত্যা করেন গৃহবধূ পলি।

জিএম ইমরান/ নিজস্ব প্রতিবেদক/ আইনিউজ

Green Tea
সারাবাংলা বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
সর্বশেষ
জনপ্রিয়