ঢাকা, রোববার   ০১ আগস্ট ২০২১,   শ্রাবণ ১৭ ১৪২৮

ইমতিয়াজ মাহমুদ

প্রকাশিত: ০০:৪৬, ১৮ জুন ২০২১
আপডেট: ১১:৩৫, ১৮ জুন ২০২১

লড়াইটা কি পরীমণির ব্যক্তিগত?

পরীমণি একটি লড়াইয়ে নেমেছেন। এটি পরীমণির ব্যক্তিগত লড়াই নয়। এই লড়াইটা বাংলাদেশের প্রতিটি নারীর লড়াই। একজন নারীর বিরুদ্ধে প্রতিটি অন্যায়ই বাংলাদেশের সকল নারীর প্রতি অন্যায়।

পরীমণিকে শারীরিকভাবে আঘাত করা হয়েছে, ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে, অকথ্য ভাষায় গালাগালি করা হয়েছে। কী ভাষায় গালাগালি করেছে ঐ লোকটা পরীমণিকে? পরীমণি সেইসব কথা উচ্চারণ করতে পারেননি, কেঁদেছেন অঝোরে।

আমি অনুমান করতে পারি কীসব শব্দ লোকটি ব্যবহার করেছে গালাগালি করতে গিয়ে। আপনি জানেন না? আপনি জানেন না নারীকে পুরুষরা কী বলে গালি দেয়? আমরা সকলেই জানি। শারীরিকভাবে প্রহার করার চেয়ে ঐসব গালি ভয়ংকর। শারীরিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত, লাঞ্ছিত অপমানিত পরীমণি গভীর রাতে গেছেন বনানী থানায়। যদি একজন নারী হয়ে থাকেন তাইলে হয়তো পুরোটা অনুমান করতে পারবেন সেই সময় পরীমণির মনের অবস্থা কি ছিল। একজন পুরুষের পক্ষে পুরোটা অনুমান করা সম্ভব হবে না।
বনানী থানা কী করেছে? ওসি সাহেব নাই। কাল সকালে আসেন।

কেন? ঐ সময় বনানী থানার ওসি সাহেব থানায় থাকবেন না সে তো অস্বাভাবিক কিছু না। কিন্তু থানায় কি একজন সাব-ইন্সপেক্টর ছিল না? একজন কনস্টেবলও কি ছিল না? ঐ সাহেবরা কেউ অভিযোগটা লিখে রাখলেন না কেন? ঐ সাহেবরা কেউ একজন সাথে সাথে ঘটনাস্থলে গেলেন না কেন? সাথে সাথে কয়েকজন পুলিশ কেন মূল অভিযুক্ত সেই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করলেন না? যে কোন মামলায়ই ঘটনার পড় যত দ্রুত সম্ভব অভিযোগ করতে হয়। পরীমণি তো সশরীরে থানায় গেছেন। টাইপ করা এফআইআর হয়তো নিয়ে যাননি, কিন্তু তিনি যে অভিযোগটা নিয়ে গেছেন সেটা কেউ একজন হাতে লিখে রাখবেন না কেন?

পরীমণি বাড়ি ফিরে গেছেন। পরদিন কি তারও একদিন পর পরিমণি তাঁর সাথে ঘটনা শিল্পী সমিতির নেতাদের কাছে বলেছেন। অনুরোধ করেছেন যে বিচার পাওয়ার জন্যে ওরা তাঁকে সহায়তা করেন। প্রথম আলোতে শিল্পী সমিতির একজন নেতার নামও উল্লেখ করেছে- জায়েদ খান নামের একজন হিরো। সেই হিরো মিয়া আর অন্যান্য নেতারা নাকি তাঁকে পরামর্শ দিয়েছেন, তুমি একটা মেয়েমানুষ, চেপে যাও, এইসব কথা নিয়ে ঘাটাঘাটি করার দরকার নাই। এইরকম সহি পরামর্শ নাকি তাঁকে আরও বেশ কয়েকজন দিয়েছেন।

পরীমণি যখন সাংবাদিক সম্মেলন করে তাঁর লাঞ্ছনার কথা সবাইকে জানিয়েছেন তাঁর পরেই কেবল দেখা গেল যে খানিকটা তৎপরতা শুরু হয়েছে। পরীমণি সাংবাদিক সম্মেলন করে ঘটনার কথা জানিয়েছেন, টেলিভিশনে এসে ঘটনার কথা বলেছেন। ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে 'মা' ডেকে তাঁর কাছে বিচার চেয়েছেন। আজ নাকি মামলা হয়েছে সাভার থানায়। একটু আগে খবর পেলাম মূল আসামি নাসিরুদ্দিনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে ওর বাড়ি থেকে। সেখানে আরেকজন আসামিকেও পাওয়া গেছে, ওর নাম অমি। গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশের লোকেরা।

আমরা আশা করতে চাই যে এই ঘটনার বিচার হবে। আমরা আশা করতে চাই যে দেশের 'ভদ্রসমাজ' পরীমণির পাশে দাঁড়াবেন। কেননা আপনাদের সমর্থন সংহতি ও সহানুভূতি পরীমণির জন্যে প্রয়োজন। একজন নির্যাতিতা নারী যখন বিচারের প্রত্যাশায় বিচার ব্যবস্থার দ্বারস্থ হয়, সে যেন একটা অসম লড়াইয়ের সূচনা। এই লড়াইয়ে একটি মাত্র নারীকে লড়তে হয় বিশাল বিপুল প্রবল প্রতিপত্তিসম্পন্ন পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে। দেশের পুলিশ ব্যবস্থা, আইন আদালত উকিল সরকার সবকিছুই নারীটির বিপক্ষে। নারীকে লড়তে হয় একা। সেই লড়াইয়ে আপনারা 'ভদ্রসমাজ' যদি নারীটির পাশে না থাকেন, তাইলে নারীটির পক্ষে জেতা সম্ভব হয় না। তিনি যেই হন।

কিন্তু খুব বেশি আশাবাদী হবেন না। এই যে 'ভদ্রসমাজ' বলছি, এই ভদ্রসমাজটি হচ্ছে পুরুষ সমাজ। কেবল যে পুরুষ সমাজ তাইই না, এটি হচ্ছে একটি পুরুষতান্ত্রিক সমাজ, চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়াশীল পুরুষতান্ত্রিক পুরুষ সমাজ। এই ভদ্রসমাজে নারী কখনোই একজন পুর্ণাঙ্গ মানুষ হিসাবে বিবেচিত হয় না। এই ভদ্রসমাজের চোখে নারী হচ্ছে দুই ভাগে বিভক্ত। যেসকল নারী পুরুষের অনুগত, পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নিয়ম মেনে নিজেদেরকে ঊনমানুষ মেনে নিয়ে অধস্তন অবস্থানেই বিরাজ করেন ওরা হচ্ছে মায়ের জাত, আর যারা পুরুষতন্ত্রের বিধান মানবে না ওরা হচ্ছে বাজে মেয়েমানুষ।

একটু অপেক্ষা করুন, দেখবেন যে পুরুষটি পরীমণির সাথে অত্যাচার করেছে ওর পক্ষে আর ও সহচরদের পক্ষে বিপুল সংখ্যক ভদ্রসমাজের নাগরিকরা দাঁড়িয়ে যাবেন। ওরা নানাভাবে আপনাকে প্রমাণ করে দিবে যে লোকটি নিতান্তই ভাল মানুষ, সে কোন মন্দ কাজ করেনি। দেখবেন যে ওরা প্রমাণ করে ছাড়বে যে পরীমণি একজন অতি মন্দ চরিত্রের রমণী। ওর সাথে যেরকম ব্যবহার করা হয়েছে সেটা খুবই স্বাভাবিক একটা আচরণ। আর যদি কোন অন্যায় ওর সাথে হয়েও থাকে সেটার জন্যেও দায়ী হচ্ছে পরীমণি নিজেই। শুধু এইখানেই ওরা থেমে থাকবে না। ওরা সকল নারীর জন্যে নসিহত নিয়ে হাজির হবে, হে নারী তুমি অন্দর মহলে যাও।

এটা যে শুধু পুরুষরাই করবে সেটাই কেবল না। শারীরিকভাবে দেখতে নারীর মত কিছু প্রাণিও সেই দলে আছে। ওরা বলবে যে, যে কোন অবস্থাতেই দোষ হচ্ছে নারীটিরই। ঐরকম রাতের বেলা যে ক্লাবে যাবে কেন? শুনতে পাবেন যে পরীমণিকে উদ্দেশ্য করে বলা হবে যে ওকে ধর্ষণ করাই উচিৎ ছিল।

না, আমি যেসব কথা বলছি এগুলো নতুন কোন কথা না। এইসব ঘটনা আপনারা নিজেরাও বহুবার দেখেছেন, এইরকম পরিস্থিতিতে নারী প্রতি কীরকম আচরণ করা হয় সেটা আপনারা সকলেই জানেন। তাইলে সেই একই কথা বারবার কেন বলি? এখন কেন সেই একই কথার পুনরাবৃত্তি করছি? কারণ আমি জানি একদিন এই অবস্থার পরিবর্তন হবে। কিন্তু সেই পরিবর্তনের জন্যে দরকার পরীমণিসহ আমাদের ঘরে ঘরে যে লক্ষ কোটি পরীমণিরা আছেন, আমার মেয়েরা, আমার বন্ধুর মেয়েরা, ওদের বন্ধুরা ওদের বন্ধুরা- এই দেশে বা এই দেশের বাইরে পৃথিবীর সর্বত্র যতো নারীরা আছে, বিশেষ করে তরুণ নারীরা, আপনাদের ঘুরে দাঁড়ানো।

সেই একই কথা বারবার করে বলি। এই সমাজ নারীকে পুর্ণাঙ্গ মানুষ বিবেচনা করে না। এই সমাজে নারী হচ্ছে ঊনমানুষ। এই সমাজের চোখে জন্মগতভাবেই পুরুষ উত্তম আর নারী অধম। বলি, আর প্রত্যাশা করি যে একদিন লক্ষ্য লক্ষ্য নারী মেরুদণ্ড সোজা করে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের চোখে চোখ রেখে মাটিতে পা ঠুকে বলবে যে না, মানি না। মানি না এইসব বিধান, মানি না এই সমাজ, মানিনা এই নিয়ম। এই দিনটা দেখবো বলেই এই কথাটা বারবার বলি- নারীর সংগ্রাম কেবল একজন পরীমণির বিচারের দাবিতেই যেন থেমে না থাকে, কিছু কল্যাণের দাবী রাজনৈতিক ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট পাওয়ার দাবির মধ্যেই যেন সীমিত না থাকে।

নারীর সংগ্রাম মানে হচ্ছে নারীর মুক্তির সংগ্রাম। এই সংগ্রামের অনিবার্য পরিণতি হচ্ছে এই সমাজ ভেঙে ফেলা। কেননা পচা গলা সমাজ না ভাঙলে নারীর জন্যে নয়া সমাজ গড়বেন কীভাবে?

ইমতিয়াজ মাহমুদ, অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

  • খোলা জানালা বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। eyenews.news-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে eyenews.news আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।
Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়