ঢাকা, সোমবার   ২৯ নভেম্বর ২০২১,   অগ্রাহায়ণ ১৫ ১৪২৮

মিহিরকান্তি চৌধুরী

প্রকাশিত: ১২:০৯, ৮ অক্টোবর ২০২১
আপডেট: ১৬:৪৭, ৮ অক্টোবর ২০২১

পেশাদারিত্ব

মিহিরকান্তি চৌধুরী, লেখক ও অনুবাদক

মিহিরকান্তি চৌধুরী, লেখক ও অনুবাদক

ইউনিভার্সিটিতে আমি ডেপুটি রেজিস্ট্রার, রেজিস্ট্রার তানভীর সাহেব আমার এক কালের ছাত্র। এতে আমার পেশাদারিত্বে কোনও বাধা আসেনি। আমি তাঁকে বস মনে করি। আমাকে তাঁর স্যার পরিচয় দেন, পরে প্রয়োজনমতো সাবটাইটেল হিসেবে ডেপুটি রেজিস্ট্রার পরিচয় দেন। আমার খালু মূখ্য হলে, জাগ্রত থাকলে আগে ডেপুটি রেজিস্ট্রার বলতেন, পরে নাম বলতেন, স্যার হয়ত বা ছারখার হয়ে যেত।

আজ থেকে  সাত বছর আগে মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটিতে যোগদানের সময় মাননীয় উপাচার্য প্রফেসর  ড. মো. সালেহ উদ্দিন স্যার আমাকে বলেছিলেন, আমাদের অফিস সময় দশটা থেকে ছয়টা। আপনার সমস্যা হবে না তো? 

উত্তর দিই, না, স্যার । আমি তো সকাল সাতটা থেকে রাত দুটা পর্যন্ত টেবিলে বসা লোক। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৩ পর্যন্ত শাহবাজপুর হাইস্কুলে পূর্ণকালীন চাকরির পর আরও দুচারটা করেছি, সবই ছিল খণ্ডকালীন যাকে বলে ঠিকা কামলা। দীর্ঘদিন পর পুনঃ মুষিক ভব। আবার পূর্ণকালীন চাকরি। যে সময়ে অন্যদের চাকরি শেষ হয় বা পিআরএল এর ভাবনা শুরু হয় তখন আমি এন্ট্রি মারছি। এন্ট্রি মারা ভারতীয় প্রভাবযুক্ত একটি শব্দসমষ্টি যা হিন্দি বলয়ে খুব দুরস্ত বা চোস্ত।

আমি সবমময়ই খুব পেশাদার ও নৈর্বক্তিক থাকার চেষ্টা করি। কিশোর, যুবক ও তরুণ বয়সের অনেক সম্ভাব্য আবেগকে পেশাদারি ভাবনা দিয়ে মোকাবেলা করেছি, মোকাবেলা করেছি আমার গণ্ডি বা পেরিফেরির মানচিত্র দিয়ে গ্রামদেশে যাকে বলে আওকাত। এটা বিদেশী শব্দ, আরবি বা ফারসি যার অর্থ গণ্ডি।

ইউনিভার্সিটিতে আমি ফরমাল বেশভূষাকেই গুরুত্ব দিই যদিও আমার কাপড়চোপড় কমদামি। চেয়ারম্যান স্যার, ভিসি স্যারের বেশভূষা, চলাফেরার সাথে আমার স্তরের যায় না। একদিন  ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে দেখি ভিসি স্যারের শার্ট ও আমার শার্ট একই রঙ, একই ডিজাইন, একই স্ট্রাইপ। একরকম পলায়ন করে করে লাঞ্চের সময় পর্যন্ত কাটিয়ে বাসায় এসে তা পরিবর্তন করে যাই। ফরমালিটির ব্যাপারে ইউনিভার্সিটির পরিচালক (প্রশাসন) জনাব তারেক ইসলাম খুবই চৌকষ। তাঁর ফরমালিটি বহুমাত্রিক ও অনুকরণীয়। আমিও শিখেছি বেশ কিছু।   

আমার ছাত্রের বাইরে কাউকে ছাত্র মনে করি না যদিও অনেকে আমার ছাত্র না হয়েও ছাত্রের সহপাঠী, বন্ধু বা সমসাময়িক আমাকে স্যারের মর্যাদা দেন, সালাম দেন। এটা তাঁদের বড়োত্ব, মহত্ব। তাঁদের পারিবারিক ভদ্রলোকচিত শিক্ষাসংস্কৃতি থেকে তা তাঁরা কওে থাকেন। আমার কোনও ছাত্রের স্ত্রীকে বা ছাত্রীর স্বামীকে জ্বি, আপনি করেই বলি, সালামও দিই এতে সেই ব্যক্তিটি বয়সে যত ছোটোই হোক। এতে সম্মান কমে বলে মনে হয় না। বয়স একটা নাম্বার, এর বেশি কিছুই নয়। এরকম পরিস্থিতিতে আমার ছাত্রের স্ত্রী বা ছাত্রীর স্বামী (অনেক ক্ষেত্রে সিলেটের বাইরের) যথেষ্ট সম্মানিত বোধ করেন। অন্তত বুঝতে পারেন তাঁর স্ত্রী বা স্বামী একজন ভদ্রলোকের ছেলের ছাত্র বা ছাত্রী ছিল (শিক্ষক ভদ্রলোক না হলেও চলবে)। এর মাধ্যমে আমার বাবাও সম্মানিত হন। আর আমার ভিতরে কোনও খালু থাকলে তিনি বিতাড়িত হন। মানুষের জীবনে খালুকে দূরে সরানো খুবই জরুরী যদিও কঠিন। 

আমাদের ইউনিভার্সিটিতে কর্মরত অনেকেই আছেন যাঁরা বয়সে আমার অনেক ছোট। তাই বলে আমি তাঁদের জুনিয়র মনে করতে পারি না। অনেক অনুরোধ করেও আমাকে দিয়ে তুমি তামি বলাতে পারেননি। আমি তাঁদের বুঝিয়েছি, আপনারা ইউনিভার্সিটির সম্মানিত শিক্ষক বা কর্মকর্তা, আপনাদের মর্যাদা আছে, আনুষ্ঠানিকভাবে, অনানুষ্ঠানিকভাবে। আমার আচরণে কেউ বিব্রতবোধ করেন না। সম্মানিত বোধ করেন। ইউনিভার্সিটিতে আমি ডেপুটি রেজিস্ট্রার, রেজিস্ট্রার তানভীর সাহেব আমার এক কালের ছাত্র। এতে আমার পেশাদারিত্বে কোনও বাধা আসেনি। আমি তাঁকে বস মনে করি। অফিসের ভিতর ও বাইরে তাঁর সাথে “জ্বি, আপনি” করে কথা বলি। তিনি কখনও বিব্রতবোধ করেন না। অনেক সম্মান করেন। আমাকে তাঁর স্যার পরিচয় দেন, পরে প্রয়োজনমতো সাবটাইটেল হিসেবে ডেপুটি রেজিস্ট্রার পরিচয় দেন। আমার খালু মূখ্য হলে, জাগ্রত থাকলে আগে ডেপুটি রেজিস্ট্রার বলতেন, পরে নাম বলতেন, স্যার হয়ত বা ছারখার হয়ে যেত। আমার লক্ষ্য অবশ্য কোনভাবেই “স্যার”কে বাঁচানো নয়, শুধু পেশাদার থাকা, নৈর্বক্তিক থাকা। তাছাড়া, সেটা পুরোনো গল্প। এই প্রসঙ্গে বাংলাদেশের একটা সমস্যার কথা বলি। অনেক বড়ো বড়ো কোম্পানি, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জিএম, ডিজিএম বা এমডি, ডিএমডি ওই প্রতিষ্ঠানের মালিক বা চেয়ারম্যান বা সিইওর ছোট ছেলেমেয়েদের কোলেকাঁকে নিয়েছেন, চকলেট দিয়ে আদর করেছেন, তারাও উনাদের শার্টকাপড় ভিজিয়েছে। এই ছোট ছেলেমেয়েরা কালের গতিতে প্রতিষ্ঠানের ডেপুটি মালিক বা ডেপুটি চেয়ারম্যান বা ডেপুটি সিইও, ক্ষেত্র বিশেষে মালিক বা চেয়ারম্যান বা সিইও হওয়ার পরও আগের দিনের আঙ্কেলরা নতুন বসকে চেনেন না, অনেকে আগের মতোই ভাতিজা-ভাতিজী মনে করেন, আঙ্কেলশিপ দেখান। ভাতিজা-ভাতিজীরাও কম যান না। তাঁরা উনাদের গারবেজ মনে করেন, অনেক সময় ডাম্পিং করেন।

২০১৩ সালে মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটিতে এমবিএ করার সময় প্রথম দিনই দ্বিতীয় ক্লাসে আমাদের এক প্রাক্তন ছাত্রকে কোর্স টিচার হিসেবে পাই। তিনি বিব্রতবোধ করেন। আমি তাঁকে বুঝিয়ে বলি, জাল নোট যাঁর কাছে সর্বশেষ পাওয়া যায় তাঁকেই পুলিশ খুঁজে। অর্থাৎ এর সর্বশেষ স্ট্যাটাস বিবেচ্য। একইভাবে আমাদের দু’জনের সর্বশেষ স্ট্যাটাস হল আপনি শিক্ষক আর আমি ছাত্র। এর পর আমার আর সমস্যা হয়নি। অন্যান্য ১৯টি কোর্সে ১৯ জন শিক্ষকের মধ্যে তিনজন ছিলেন বয়সে আমার বড়ো। বাকীরা শুধুমাত্র বয়সের গণিতে আমার চেয়ে ছোটো ছিলেন। জ্ঞানে-গুণে, মানে-মর্যাদায়, আচারে, যোগ্যতায় সর্বোতভাবে তাঁরা আমার চেয়ে যোগ্যতর ছিলেন, এগিয়েছিলেন। তাই সেরা ফলাফল করে বেরিয়িছিলাম। নতুন প্রজন্মের সহপাঠীরা আমার সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেনি (৩.৯৯/ ৪.০০)। এই শিক্ষক মহোদয়গণ এখনও অফিসে আমার কাছে কোনও কাজে আসলে আমি দাঁড়িয়ে কথা বলি। তাঁদের সম্মান দেওয়ার উছিলায় নিজে সম্মানিত হই। মহানবীর আমলে তাঁর চেয়ে বয়ষ্ক অনেক সাহাবী তাঁকে নবীর মর্যাদা দিতেন, রসুল মানতেন, তাঁর সাথে শ্রদ্ধাভরে, বিনম্রভাবে কথা বলতেন। এ বিষয়গুলো আমাদের প্রাণিত করে। বয়স জগতে একমাত্র বিষয় নয়। 

ছোট ক্লাস থেকে মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত সিনিয়র জুনিয়র চলে। কর্মজীবনে সেটা চলে না। আপনার তিন চার বছরের সিনিয়র কেউ আপনার অধস্তন হতে পারেন। আবার আপনার তিন চার বছরের জুনিয়র কেউ আপনার বস হতে পারেন।

খালুভাবনা কত যে মারাত্মক হতে পারে তার ছেটো একটা গল্প আছে। ভারতে ড. পি.সি. আলেকজান্ডার (পাদিনজারথালাকাল চেরিয়ান আলেকজান্ডার) ছিলেন ডাকসাইটে আমলা । ছয় দশকের এক উল্লেখযোগ্য কর্মজীবনে পি.সি. আলেকজান্ডার বিভিন্ন সময়ে দুই  প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ছিলেন, ইন্দিরা গান্ধী এবং রাজীব গান্ধীর। রাজীব গান্ধী, সঞ্জয় গান্ধীকে একেবারে ছোটো দেখেছেন, কোলে নিয়েছেন, আদর করেছেন, কতকিছু! ইন্দিরা গান্ধীকে সমীহ করতেন। রাজীব গান্ধীকে প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে ভাগ্নে, ভাতিজা বেশি মনে করতেন। যখনই আঙ্কেলশিপ দেখিয়েছেন, রাজীব গান্ধী তাঁকে সরিয়ে দিয়ে যুক্তরাজ্যে ভারতীয় হাইকমিশনার করেন। পরবর্তীকালে তামিলনাড়ু ও মহারাষ্ট্রের গভর্নর এবং রাজ্যসভার সাংসদ হলেও ২০০২ সালে ভারতের রাষ্ট্রপতির মনোনয়নে কংগ্রেসের আপত্তির কারণে ছিটকে পড়েন।

আজকাল বাংলাদেশ কর্পোরেট সংস্কৃতিতে ভাসছে তবে এই সংস্কৃতির মূল প্রাণশক্তি ফরমালিটিকে বাদ দিয়ে। সিইওকে যখন নবীন কর্মকর্তা ডিয়ার স্যার বলেন, সবশেষে ইয়রস্ সিনসিয়ারলি লেখেন তখন ফরমালিটির দড়ি নিজে থেকেই ছিড়ে যায়। কর্মস্থলে টি-শার্ট, স্যান্ডেল, সিইওর সাথে আড্ডা, হাস্যরসের আলাপ মহামারীর মতো ছড়িয়েছে। মান্যতা, ভব্যতা ও ক্যাপাসিটিকে অ্যাড্রেস করতে না পারলে টয়লেট পেপার, টিস্যু পেপার, এসি, দামি আসবাবপত্র, পর্দা দিয়ে কর্পোরেট সংস্কৃতি কতটুকুই বা এগোবে সন্দেহ আছে।

মিহিরকান্তি চৌধুরী, অনুবাদক ও নির্বাহী প্রধান, টেগোর সেন্টার, সিলেট।

  • খোলা জানালা বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। eyenews.news-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে eyenews.news আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আইনিউজ ভিডিও স্টোরি

আইনিউজের ভিডিওতে দেখুন হাইল হাওরের বাইক্কাবিলের সৌন্দর্য-

মহানবীর ব্যঙ্গচিত্র আঁকা সেই কার্টুনিস্ট মারা গেলেন যেভাবে

মৌলভীবাজারে আছিয়া বেগমের হাতে ১০০০ নিরাপদ শিশুর জন্ম

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়