ঢাকা, সোমবার   ১৬ মে ২০২২,   জ্যৈষ্ঠ ২ ১৪২৯

ইমন আহমেদ

প্রকাশিত: ১৬:০৭, ১৭ ডিসেম্বর ২০২১
আপডেট: ২১:৪০, ১৮ ডিসেম্বর ২০২১

বাবার মুখে শোনা মুক্তিযুদ্ধের গল্প

ইমন আহমেদ

ইমন আহমেদ

পাক বাহিনীর চেকপোস্টে তাঁকে বাধা দিয়ে কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে বাইসাইকেলটি। পাক হায়েনারা শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি হাসি তামাশায় মেতে উঠে। একজন পাকসেনা বাইসাইকেল নিয়ে পাশে এসে দিয়ে দেয় আবার আরেকজন এসে কেড়ে নেয়।

তখন ১৯৭১ সাল, উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বাজছে যুদ্ধের দামামা। আমার বাবা চাকরিসূত্রে উনার কর্মস্থল মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী ধলই চা বাগানে। বৃহত্তর সিলেটের উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ আক্রান্ত স্থান ধলই চা বাগান। এখানে কয়েকটি সম্মুখযুদ্ধসহ পাকবাহিনীর উপর মুক্তিবাহিনীর কয়েকটি অপারেশন সংঘটিত হয়।

এই ধলই চা বাগানে সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হন দেশের ৭ বীরশ্রেষ্ঠের একজন বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী হামিদুর রহমান। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে একদিন আব্বা জোহরের নামাজ পড়ে মসজিদ থেকে বের হয়ে দেখলেন উনার সামনে দিয়ে একজন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মেজর হেটে যাচ্ছেন। আব্বা সেখানে দাঁড়ানো অবস্থায় ৩ থেকে ৪ মিনিটের মাথায় বিকট শব্দ হলো। সাথে সাথে উনি তাকিয়ে দেখলেন সেই পাকিস্তানি মেজরকে আর দেখা যাচ্ছে না। কোনো এক গাছের ওপর থেকে মুক্তিসেনার ছোঁড়া বোমার আঘাতে মারা গেলেন পাক মেজর। 

আরও পড়ুন- নব উচ্ছ্বাসে এগিয়ে যাক বাংলাদেশ

আমার এক চাচা শহীদ মোশাহিদ উদ্দিন আহমদ (আব্বার আপন চাচাতো ভাই) মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলে অবস্থান করার সময় নির্মমভাবে পাক হানাদার বাহিনীর হাতে শহীদ হন। 

শহিদ মশাহিদ উদ্দিন আহমদ

আমার বড় চাচা শহীদ মোজাহিদ উদ্দিন আহমদ সাদেক কর্মসূত্রে ছিলেন কমলগঞ্জের কুরমা চা বাগানের সাবডিভিশন বাঘাছড়া চা বাগানে। তিনি ছিলেন অত্র এলাকার মুক্তি সংগ্রাম কমিটির ইউনিয়ন শাখার আহবায়ক। ১৯৭১ সালের ২৮ মে পাক হানাদার বাহিনী উনাকে ধরে নিয়ে কমলগঞ্জের শমসেরনগর বিমানঘাটি এলাকায় পাশবিক অত্যাচার আর নির্যাতনের পর হত্যা করে। বড় চাচাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার অনেকদিন পর এই খবরটি পাওয়া যায়।

আরও পড়ুন- ১৯৭১ : উদয়ের পথে রক্তের দাগ

তিনি নিখোঁজ হওয়ার পর আমার আব্বা চাকুরির পাশাপাশি অনেকভাবে বড় চাচার সন্ধান করতে থাকেন। একদিন আব্বা বড় চাচাকে খোঁজার উদ্দেশ্যে ধলই চা বাগান থেকে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে মৌলভীবাজার শহরে আমাদের বাড়িতে আসার জন্য বাইসাইকেল যোগে রওয়ানা হন। পথিমধ্যে শ্রীমঙ্গল আসার পর পাক বাহিনীর চেকপোস্টে উনাকে বাধা দিয়ে কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে উনার বাহন বাইসাইকেলটি। পাক হায়েনারা উনাকে শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি হাসি তামাশায় মেতে উঠে। একজন পাকসেনা বাইসাইকেল নিয়ে পাশে এসে দিয়ে দেয় আবার আরেকজন এসে কেড়ে নেয়। এভাবে অনেকক্ষণ উনাকে নিয়ে পরিহাস করার পর শ্রীমঙ্গলের এক বিশিষ্ট ব্যক্তির উপস্থিতিতে উনাকে বাইসাইকেলসহ ছেড়ে দেওয়া হয়। 

শহীদ মোজাহিদ উদ্দিন আহমদ সাদেক

আরও পড়ুন- মুক্তিযোদ্ধা পিয়ারা মিয়ার লেখা ‘আমার মুক্তিযুদ্ধ’

আরেকদিন বড় চাচার খোঁজে উনার কর্মস্থল ধলই চা বাগান থেকে পাশ্ববর্তী কুরমা চা বাগানে যাওয়ার পথে আব্বাকে আটক করে পাক হায়েনারা। উনাকে নিয়ে হত্যা করার উদ্দেশ্যে মাথা নিচের দিকে দিয়ে একটি কাঁঠাল গাছে বাঁধা হয়। এই পরিস্থিতির মধ্যে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন এক পাকিস্তানি বিহারী। তিনি আব্বার পূর্ব পরিচিত এবং চাকুরিসূত্রে উনার সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তিনি সাথে সাথে পাকবাহিনীর উপস্থিত মেজরকে বলেন, ওর রশির বাঁধন খুলে নিচে নামাও। আমি ওকে এই অবস্থায় দেখতে চাইনা। তোমরাই নির্দেশ দিলে চা বাগান চালু রাখার জন্য। আবার তাদের উপর তোমরাই নির্যাতন চালাচ্ছো। উনার তাৎক্ষণিক উপস্থিতিতে আল্লাহর অশেষ রহমতে বেঁচে গেলেন আব্বা। 

শহীদ মোজাহিদ উদ্দিন আহমদের স্ত্রীকে পাঠানো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চিঠি 

আমি লেখক নই, আব্বার মুখে শোনা গল্প গুলো সংক্ষেপে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র। সবাই ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।

স্বাধীনতার সূবর্ণ জয়ন্তীতে ৫০তম মহান বিজয় দিবসে সবাইকে জানাই বিজয়ী শুভেচ্ছা।

ইমন আহমেদ, সমাজকর্মী 

৮ ডিসেম্বর মৌলভীবাজার মুক্ত দিবসে বর্ণাঢ্য পতাকা র‍্যালি

ঘুরে আসুন মৌলভীবাজারের পাথারিয়া পাহাড়

মৌলভীবাজারের বিস্ময় বালিকা : ১৯৫ দেশের রাজধানীর নাম বলতে পারে

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়