ঢাকা, শুক্রবার   ২২ অক্টোবর ২০২১,   কার্তিক ৬ ১৪২৮

হেলাল আহমেদ

প্রকাশিত: ২১:৩৮, ২৬ আগস্ট ২০২১
আপডেট: ২২:৪১, ২৬ আগস্ট ২০২১

বঙ্গদেশীয় নারীবাদ: কিংবা কিছু কথা

যেমন করিয়া আপনারা চাহেন তেমন করিয়া নহে। আপনাদের চাওয়ায় সার নাই আগেই বলিয়াছি। আপনারা চাহেন নারীরা ইচ্ছামতো পোশাক পড়িয়া ঘুরিয়া বেড়াক। কিন্তু আপনাদিগের এ চাওয়া নারীর মুক্তির জন্য কি আদৌ? নাকি নারীদেহ দেখিবার সুবিধা হয় বলিয়াই চাহেন নারীদের পোশাকের স্বাধীনতা চাই! 

আজকের দিন হইতে দুইশত ঊনত্রিশ বৎসর আগে নারীমুক্তির প্রথম মহাঘোষণাটি আসে বিলেতি নারীবাদী মেরি ওয়েলস্টোনক্র‍্যাফটের মাধ্যমে। মেরি তাহার 'ভিন্ডিকেশন অব দ্য রাইট অব উইমেন' বইয়ে সেই মহাঘোষণাটি দেন ১৭৯২ সালে। এই বঙ্গদেশ যখন বাংলা হয় নাই, যখন এই অঞ্চলে নারীশিক্ষার কথা অনেকটা মধ্যরজনীতে দেখা স্বপনের মতোন ছিলো সেই সময় সাত সাগর তেরো নদীর ওই পারে বিলেতে এক মহীয়সী নারীর কলমে উঠিয়া আসিয়াছিলো নারীমুক্তির দাবি।

মেরির বইখানা বেরুনোর পরেই চারিদিকে নারীমুক্তির জন্য নারীরা বাহির হইয়া আসিতে থাকেন। ধীরে ধীরে কাঁপুনি শুরু হয় চলমান পুরুষতন্ত্রে। তাহারা বুঝিতে পারে নারীদেরকে অবলা বলিয়া আর বেশিদিন গৃহবন্দী করিয়া রাখা যাইবে না। আসলে মেরির বইখানার লেখ্য বিষয় এমনি ছিলো যাহা পুরুষতন্ত্রের ভীত কাঁপাইয়া দিয়াছিলো। কিন্তু যাহা বলিতেছি তাহা বিলেতের গপ্প। পুণ্যভূমি ভারতবর্ষ কিংবা অধুনা বঙ্গভূমির নয়।

আমাদিগের ভারতবর্ষ এবং বঙ্গদেশে তখনো সহমরণের মতো বিষে নারীরা প্রতিনিয়ত নীলকন্ঠ হইতেছিলেন। স্বামী মরিলে সেই মরা স্বামীর সহিত জীবিত স্ত্রীকে পুড়াইয়া ফেলাকে তখনো এইখানে পূণ্যের কর্ম বলিয়া গণ্য করা হইতো। অপরদিকে, মুসলমানদিগের গৃহের অন্ধকার কামড়ায় পড়িয়া পঁচিতেছিলেন মুসলিম নারীরা। না পাইতেছিলেন শিক্ষা, না পাইতেছিলেন বাঁচিবার ক্ষেত্রে নূন্যতম নারী স্বাধীনতা। গৃহের বাহিরে গমনই তাহাদের জন্য ছিলো পাপকর্ম। অবশ্য মাঝে রাজা রামমোহন রায় এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের উদ্যোগে সহমরণ, বিধবাবিবাহ প্রথার মতো কিছু নিকৃষ্ট জিনিস রহিত করা গেলেও শেষপর্যন্ত নারীদের প্রকৃত মুক্তি মিলিলো না। মিলিলো না কারণ, এই দুই মহৎ ব্যক্তিও ভারতবর্ষের নারীদের যেইটুকু প্রাণে বাঁচার অধিকার আনিয়া দিতে সক্ষম হইয়াছিলেন সেইটুকুও ধর্মকে উল্টাইয়া পাল্টাইয়াই। 

অপরদিকে এই দুইটি গোষ্ঠী অর্থাৎ হিন্দু এবং মুসলিম নারীদেরকে দমাইয়া রাখিতে ভারতবর্ষের পুরুষগণ ব্রহ্মাস্ত্ররূপে ওই ধর্মকেই ব্যবহার করিয়াছিলেন। তাই নারীরাও ধর্মভীরু হইয়া দীর্ঘকাল পুরুষদের পদানতই রহিলেন। এখনো যে নাই তাহাও একেবারে বলা যায় না। ইহার ফলস্বরূপ মেরি যেই সময় তাহার 'ভিন্ডিকেশন অব দ্য রাইট অব উইমেন' বইটি লিখিয়া নারীমুক্তির সুবাতাস ছড়াইয়াছিলেন সেই বাতাসের ছিটেফোঁটাও আসিয়া এই ভারতবর্ষে লাগিতে পারে নাই। এই ভারতবর্ষের নারীগণ বুঝিতেই পারিলেন না তাহারা যখন গৃহস্বামীর পদতলে বসিয়া পিষ্ট হইতেছিলেন তখন বিশ্বের অপরপ্রান্তে আরেকদল নারী তাহাদের দাবি আদায় করিবার লড়াইয়ে নামিয়াছেন। আমরা নারীমুক্তির সুবাতাস পাইলাম তাহারও বহু পরে। 

মেরির বই প্রকাশের প্রায় একশত বারো বৎসর পরে যখন রোকেয়া সুলতানা নামের এক বঙ্গীয় নারী 'নবনূর' পত্রিকায় লিখিলেন- 'আমাদিগকে অন্ধকারে রাখিবার জন্য পুরুষগণ ওই ধর্মগ্রন্থগুলোকে ঈশ্বরের আদেশপত্র বলিয়া প্রকাশ করিয়াছেন...' তখন এই দেশের পুরুষতন্ত্রের শিরদাঁড়ায় ঠাণ্ডা একটা স্রোত বহিয়া গেলো। ইহার কারণ, ভারতীয় পিতৃতান্ত্রিক কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে তৎকালীন সময়ে একজন নারীর পক্ষে এই কথা বলিয়া দেওয়া চাট্টিখানি কথা নহে! রোকেয়া সেই কথাটিই বলিলেন, পুরুষতন্ত্র যাহাকে ভয় পাইয়া আসিয়াছে এতোদিন। একজন বাঙালি নারী যিনি অনুভব করিতে পারিয়াছিলেন এই দেশের নারীগণ আসলে মুক্ত নেই। এই দেশের নারীদের পুরুষরা শুধু ভোগ করিয়াই আসিয়াছে। পশুর চাইতেও নির্মম ব্যবহার তারা নারীদের সাথে করিয়া আসিয়াছে। আর এইসব করিতে পুরুষগণ যে ধর্মগ্রন্থকে সহায়ক হিশেবে কাজে লাগাইয়াছেন তাহাও রোকেয়ার বোধগম্য হইতে অসুবিধা হইলো না। তাই রোকেয়া পুরুষদের বিপক্ষে নারীমুক্তির জন্য প্রথম আঘাতটি হানেন পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ও সেই সমাজের সৃষ্ট আদি সংগঠন ধর্মের উপরে। তিনি বেশ স্পষ্ট করিয়াই বলিলেন, 'ধর্মগ্রন্থগুলো যদি নারীরা লিখিতো তবে সেইখানে পুরুষদের মতো নারীদেরও জয়জয়কার থাকিতো।' যেই কথা তাহারও আগে আরেক পশ্চিমা নারীবাদী বলিয়াছিলেন। যিনি চলমান বাইবেলকে বাতিল করিয়া দিয়াছিলেন। রোকেয়া হয়তো সেই পশ্চিমা নারীবাদী নারীটিকে চিনিতেন না, কিন্তু আদর্শ আর বিপ্লবী হাওয়া তাহাদেরকে ঠিকই এক জায়গায় মিলিত করিয়া দিয়াছিল। 

কিন্তু বর্তমান নারীবাদীদের চিন্তাভাবনার সহিত রোকেয়ার আদর্শ মিলিতেছে কী? এতোটুকু লিখিবার পর এই প্রশ্ন দেখিয়া অনেকেই অবাক হইতে পারেন। অবাক হইবার কিছু নাই, আমি এতোক্ষণ যে গীত গাইলাম তা এই প্রশ্নের উত্তর পাইবার আশাতেই। কারণ, বর্তমান নারীবাদীদের দেখিলে ইহা মনে হয় যে, তাহাদের নারীবাদ শুধুমাত্র মোটা টিপ পরা, শরীরের মেদ দেখাইয়া শাড়ি পরা, জনসম্মুখে সিগারেট পান করিবার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এই অংশখানি পড়িয়া অনেকেই আমার উপর ক্ষুব্ধ হইবেন এই ভাবিয়া যে, আমিও হয়তো সেই কুসংস্কারাচ্ছন্ন পুরুষগণের মতো নারীদের গৃহে বন্দী করিয়া রাখার পক্ষের লোক। আসলে কিন্তু তা নহে। আমি যাহা জানিতে চাই- রোকেয়া সুলতানা শাড়ি পরিয়াও নারীদের মুক্তির জন্য তৎকালীন সময়ে যেই আন্দোলন করিয়া গেছেন তাহার লেখায়, আদর্শে, আমাদিগের বর্তমান নারীবাদীরা মোটা টিপ পরিয়া, শরীরের মেদ দেখাইয়া শাড়ি পরিয়া, জনসম্মুখে সিগারেট খাইয়াও সেইরূপ কিছু আদৌ করিতে পারিতেছেন কী? তাহারা তো রোকেয়ার মতো শাড়ি পরা সাধারণ আটপৌরে বাঙালি নারী নন, এইটা তাহারা স্বীকারও করিবেন না। কারণ, তাহাদের অনেক উন্নতি হইয়াছে বলিয়াই তাহারা মনে করেন।

কিন্তু জানিবার বিষয় এইটা- 'তাহারা আদৌ বিগত এক দশকে এদেশের নারীদেরকে কতোখানি মুক্তি আনিয়া দিতে পারিয়াছেন? বিগত এক দশকে যতোগুলো নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, নারীর সহিত সহিংসতার ঘটনা ঘটিয়াছে তার কয়টি ঘটনার সুবিচার তাহারা পাইয়া দিতে সক্ষম হইয়াছেন? উপরন্তু, এইসকল নারীবাদীদের নামে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকার সংবাদ পড়িয়া লজ্জা পাইতে হইয়াছে। কেউ জনসম্মুখে ধূমপান করিয়া সমালোচিত হইয়াছেন, কেউ শরীর দেখাইয়া শাড়ি পরিয়া সমালোচিত হইয়াছেন। কোন কোন নারীবাদীর তো ধর্ষণের মতো বিষয়ের সঙ্গে সহযোগী হিশেবে জড়িত থাকিবার কথাও উঠিয়াছে! তাহাদের দশা এইরূপ কেন হইলো এইটাই আমি জানিতে চাই। 

দেশে যে একেবারেই নারীমুক্তির কান্ডারী কেহই নাই তা নহে। অনেকেই আছেন যাহারা নারীদের জন্য মনপ্রাণ বিলাইয়া কাজ করিয়া যাইতেছেন। কিন্তু তাহাদের সংখ্যা ওই নারীবাদীদের চাইতে বহু কম। এবং একারণে তাহাদিগকে বিভিন্ন সময় ওইসব অতি নারীবাদের কারনে বিপদের সম্মুখীনও হইতে হয়। এইটা আশা করি তাহারাও বুঝিয়া থাকিবেন। 

কথা হইলো পুরুষগণের সহিত পার্কে, রাস্তায়, চায়ের দোকানে, জনসম্মুখে ধূমপান করিবার স্বাধীনতা, শরীরের মেদ দেখাইয়া শাড়ি পরিধানের স্বাধীনতা কী আদৌ নারীদিগের মুক্তি আনিয়া দিতে পারিবে? 

এই বঙ্গদেশে সাম্প্রতিককালে যাহা দেখিয়াছি: বোরকা পরিধান করা নারী হইতে শুরু করিয়া আধুনিকা নারী দুই পক্ষই সমানতালে ধর্ষণের শিকার হইয়াছেন। কখনো আড়ালে কখনো প্রকাশ্যে। চলচ্চিত্রের নায়িকা পরিমনীর সহিত যাহাকিছু ঘটিতেছে সেসব ঘটনার বিপরীতে নারীর পক্ষের বল হিশাবে বর্তমান নারীবাদের ভূমিকা কী? তাহারা ফেসবুকে নানা কথা বললে বা লিখিলেও বাস্তবে তাহার পাশে কয়টি নারীবাদীকে দেখা গিয়াছে? তাহাদের ফেসবুকবাসী এসব লেখা বা কথা আদৌ পরীর জন্য কোন সুফল আনিতে সক্ষম হইয়াছে কি? বরং, পরীর ঘটনার বদৌলতে নারী সম্পর্কে আপামর বাঙালির নিকৃষ্ট ধ্যান-ধারণার একটা পরিচয় পাওয়া গিয়াছে বটে।

এসব ঘটনা কি আমাদিগকে এখনো সেই ইঙ্গিত দেয় নাই যে, আমাদের বঙ্গদেশীয় নারীবাদের বাইরের দিকটাতে সুন্দর ছাল আছে বটে, কিন্তু ইহার ভিতরে কোন সারবস্তু নাই। শ্রীহট্টে একখানা প্রবাদ আছে, 'লাভ নাই লাভ নাই, ছুছা খালি সার নাই'। মাঝেমধ্যে মনে হয় এদেশের নারীবাদ এবং বাদীদেরও একই অবস্থা চলিতেছে। তাহারা নারীদের সহিত কিছু অন্যায় হইলে ফেসবুক সমাজে আসিয়া দুইকথা লিখেন, বলেন বা আলোচনা করেন কিংবা রাস্তায় নামিয়াও গলা ফাটাইয়া মিছিল করেন বটে কিন্তু ইহা নারীদের জন্য কোন সুফলই বহিয়া আনিতে পারেনাই। পেরেছে কি? পারিলে এতোসব নারীবাদীর চোখের সামনে একটা নারীকে এই আধুনিক বিশ্বে শুধুমাত্র মদ্দ পান করিবার দায়ে বারংবার লালঘরে পাঠানো হইতো না। তাহারা সদলবলে ঝাঁপাইয়া পড়িতো ওই নারীটিকে উদ্ধারের লাগি। ঝাঁপাইয়া পড়িতেছেন না কারণ, তাহাদের মুখের বুলের সহিত বুকের বলের কোন সম্বন্ধ নাই। তাহারা মুখে মাইকের সামনে যাহা বলিয়া বেড়ান তাহার বেশিরভাগটাই বুকে পৌঁছাইতে পারেনা বলিয়াই মনে হয়। কিন্তু এসকল দূর হইবার দরকার। বঙ্গদেশের নারীরা এখনো মুক্ত হয় নাই, বরং এই আধুনিককালে আসিয়া আধুনিকভাবে নারীগণ পুরুষদের পদানতই রহিয়া আছেন। তাহাদের যেই মুক্তির কথা রোকেয়া ভাবিয়া গেছেন তাহা এখনো আসে নাই। কিন্তু দিনদিন দেশে নারীবাদীদের সংখ্যাও বাড়িতেছে। 

এই দীর্ঘ লেখা পড়িবার শেষে আপনার মনে প্রশ্ন জাগিতে পারে: আমি কি আদৌ নারীমুক্তি চাই? নাকি চাই না? উত্তরে বলিবো- চাই। কিন্তু যেমন করিয়া আপনারা চাহেন তেমন করিয়া নহে। আপনাদের চাওয়ায় সার নাই আগেই বলিয়াছি। আপনারা চাহেন নারীরা ইচ্ছামতো পোশাক পড়িয়া ঘুরিয়া বেড়াক। কিন্তু আপনাদিগের এ চাওয়া নারীর মুক্তির জন্য কি আদৌ? নাকি নারীদেহ দেখিবার সুবিধা হয় বলিয়াই চাহেন নারীদের পোশাকের স্বাধীনতা চাই! 

আমিও চাই নারীদের প্রকৃত মুক্তি হোক। কিন্তু পোশাক বদল করিয়া সেই মুক্তি মিলিবে বলিয়া মনে হয়না। পোশাক-আশাক শরীরের বিষয়, আর মুক্তি মনের বিষয়। নারী শরীরকে পোশাকে রাঙাইয়া ঘুরিয়াবেড়ানো যায় নারীমুক্তি পাওয়া যায়না। ইহার জন্য মানসিক পরিবর্তন খুবই দরকার বলিয়া মনে হয়। 

 হেলাল আহমেদ, কবি

  • খোলা জানালা বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। eyenews.news-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে eyenews.news আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।
Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়