ঢাকা, মঙ্গলবার   ৩০ নভেম্বর ২০২১,   অগ্রাহায়ণ ১৫ ১৪২৮

কবির য়াহমদ

প্রকাশিত: ১৪:১৭, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১
আপডেট: ১৪:২২, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১

অনলাইনে ‘সহমত ভাই’ আর ‘স্যার সংস্কৃতি’

সংগৃহীত ছবি

সংগৃহীত ছবি

অনলাইনে বেশিরভাগ লোককেই আওয়ামী লীগ সমর্থক বলে দাবি করতে দেখা যায়। তবে এই দাবি কতটা আদর্শিক, কতটা স্বার্থ সংশ্লিষ্ট এ নিয়ে প্রশ্ন আছে। আওয়ামীপন্থী অ্যাক্টিভিস্ট বলে দাবি যারা করছে তাদের বেশিরভাগকেই সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মসূচিগুলো প্রচার করার চাইতে নিজেদেরকে উপস্থাপন আর ক্ষমতাবানদের তোষামোদের মাধ্যমে তাদের চোখে পড়ার চেষ্টা করতেই দেখা যায়।

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ও অপপ্রচার রোধ এবং উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড প্রচারে লাখো অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টের সমন্বয়ে একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরির কাজ শুরু করেছে আওয়ামী লীগ। দলটির বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপকমিটি এনিয়ে কাজ করছে। এ নিয়ে প্রশিক্ষণ কর্মশালাসহ নানামুখী কাজ ইতোমধ্যেই সম্পাদিত হয়েছে। অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট তৈরির এই কাজে সার্বিক সহযোগিতা দিচ্ছে আওয়ামী লীগের গবেষণা সেল সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন (সিআরআই)। গত শনিবার রাজধানীতে অনুষ্ঠিত এক কর্মশালা উদ্ধৃত করে এমন খবর দিয়েছে গণমাধ্যম।

সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের বরাত দিয়ে গণমাধ্যম জানাচ্ছে, ইতোমধ্যে তাদের সত্তরটি কর্মশালা সম্পন্ন হয়েছে। তাদের লক্ষ্য জেলা পর্যায়ে ১০ হাজার মাস্টার ট্রেইনার তৈরি। আর এই মাস্টার ট্রেইনারদের দ্বারা তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত এক লক্ষ অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট তৈরি করা। আগামীতে এইধরনের কর্মশালা ওয়ার্ড পর্যায়েও পরিচালিত হবে বলে দায়িত্বশীলরা জানিয়েছেন। আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপকমিটির ভাষায়- প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী যেন আগামী দিনে কোনো প্রকার গুজব ও অপপ্রচারের মাধ্যমে উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত না করতে পারে সেই লক্ষ্যে কাজ করবেন এই অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপকমিটির লাখো অ্যাক্টিভিস্ট তৈরির এই ঘোষণায় ইতোমধ্যে অনেকেই নড়েচড়ে বসেছেন। বিএনপির পক্ষ থেকেও এর প্রতিক্রিয়া এসেছে। দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী বলেছেন, ‘আগামী দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে সত্যকে ঢাকতে সরকার এক লাখ অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টের প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে।’ বিএনপির এই নেতার অভিযোগ, ‘সাংবাদিকরা যাতে সঠিক তথ্য প্রচার করতে না পারে সেজন্য এই লাখো অ্যাক্টিভিস্টের প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হয়েছে। এসব অ্যাক্টিভিস্টের মাধ্যমে মিথ্যা তথ্য প্রচারের জন্যে এই প্ল্যাটফর্ম।’ বিএনপির পক্ষ থেকে এমন প্রতিক্রিয়া এবারই প্রথম এলেও এই লাখো অ্যাক্টিভিস্ট তৈরির ঘোষণা কিংবা কর্মসূচি আওয়ামী লীগের নতুন কিছু নয়, এটা আগে থেকেই চলমান।

প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, এরআগে এ বছরের জানুয়ারিতেও আওয়ামী লীগের একই উপকমিটির অপর এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, ‘মাঠের রাজনীতিতে সফলতা না পেয়ে একটি মহল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে বেছে নিয়েছে। কোনো অপপ্রচার বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশের সুযোগ নিয়ে যারা সরকারের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করছে, তাদের বিপক্ষে সত্য প্রচারে সবাইকে অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট গ্রুপ গড়ে তুলতে হবে।’ [সমকাল, ১৩ জানুয়ারি ২০২১, প্রিন্ট ভার্সন] এরও কয়েক বছর আগে অর্ধশতাধিক ‘আওয়ামীপন্থী অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট’ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গণভবনে গিয়েছিলেন, যদিও সেই সাক্ষাৎকারীদের পরিচয় সম্পর্কে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আওয়ামীপন্থী অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরাই প্রশ্ন তুলেছিলেন। ওই প্রশ্ন শেষ পর্যন্ত প্রশ্নের পর্যায়েই থেকেছিল। উত্তর মেলেনি!

ডিজিটাল বাংলাদেশে মানুষের অনলাইন-নির্ভরতা বাড়ছে। যেকোনো ঘটনার তাৎক্ষণিক খবরের সঙ্গে সঙ্গে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মেলে। এই অনলাইন নির্ভরতার সময়ে গুজব ও অপপ্রচার প্রতিরোধ, সরকারের নানামুখী উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের প্রচারণা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কেন্দ্রিক হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এ লক্ষ্যে অনলাইনে নিজেদের লোক গড়ে তোলা স্বাভাবিক এক প্রক্রিয়া। এটা একটা রাজনৈতিক দলের জন্যে জরুরি বলেও মনে করি। আরও আগে এইধরনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারত। তবে এতদিন হয়নি বলে এখন করা যাবে না এমন ত না, তাই এটা সঠিকভাবে করতে পারলে আওয়ামী লীগই লাভবান হবে।

টানা তৃতীয় মেয়াদের আওয়ামী লীগ সরকারের এই সময়ে মাঠের রাজনীতি দৃশ্যমান নেই। দুর্নীতির মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত খালেদা জিয়া নামেমাত্র রাজনীতিতে আছেন। দলটির কোনো পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও মাঠের রাজনীতিতে নেই। এখানে সরকারের দমননীতিকে অস্বীকার করা যাবে না ঠিক তবে বিএনপির মধ্যে নেতৃত্বশূন্যতার প্রবল প্রভাব পরিলক্ষিত। কেবল বিএনপিই নয়, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার কারণে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অবস্থানও দৃশ্যমান নয়। দলটির সাধারণ সম্পাদকসহ শীর্ষ নেতারা মিডিয়ার সামনে নিয়মিতভাবে বিরোধীদলের বিরুদ্ধে বক্তৃতা-বিবৃতি দেওয়া ছাড়া আর কিছুই করেন না। আওয়ামী লীগবিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপির অবস্থাও একই। জাতীয় পার্টি নামেমাত্র সংসদে বিরোধীদল। জাতীয় দিবসগুলোতেও দেশব্যাপী আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কর্মসূচিও থাকে না। ওই দিবসগুলোর অধিকাংশই প্রশাসনের মাধ্যমে পালিত হয়ে থাকে, যেখানে ইউএনও-ওসিসহ মাঠপ্রশাসনের লোকজনেরাই আয়োজক আর সংশ্লিষ্ট এলাকার নেতাদের কয়েকজনের উপস্থিতি ছাড়া প্রান্তিক পর্যায়ের অপরাপর নেতাকর্মীরা থাকেন উপেক্ষিত।

এরবাইরে অনলাইনে আওয়ামী লীগপন্থী অ্যাক্টিভিস্টদের যারাই সক্রিয় রয়েছেন তাদের অধিকাংশকেই সরকারের গৃহীত কোন কর্মকাণ্ড প্রচারে উদ্যোগী হতে দেখা যায় না। সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মসূচির প্রচারের চাইতে তারা নেতাদের তোষামোদ ও প্রশাসনের লোকজন নিয়েই আগ্রহী হয়ে পড়েছেন। বলা যায়, সরকারের কর্মসূচি প্রচারের চাইতে তাদের ওপর ভর করেছে ‘সহমত ভাই কালচার’ ও ‘স্যার কালচার’। নেতাদের ছবি ও স্ট্যাটাসে ‘সহমত ভাই’ উচ্চারণে এবং প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিশেষত ওসি, ইউএনও-এসপিদের ‘স্যার-স্যার’ উচ্চারণে তারা যেভাবে ব্যস্ত থাকেন এটা অনেক সময় দৃষ্টিকটুও ঠেকে। অনুকম্পাপ্রত্যাশায় তাদের এই ‘ভাই কালচার’ ও ‘স্যার কালচার’ আদতে আওয়ামী লীগ সরকারের অনলাইন প্রচারে দুর্বল করে দিয়েছে। ফলে অনলাইনের অনেক গুজব ও অপপ্রচার ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে দলটি। এমন অবস্থায় দলটির বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপকমিটির এই উদ্যোগ শুরুতেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। অনলাইনে শক্তিমান হয়ে থাকা ‘সহমত ভাই কালচার’, ‘স্যার কালচার’ থেকে সহসা বেরিয়ে আসা অনেকের পক্ষে সম্ভব নাও হতে পারে। একই সঙ্গে একসময় ‘সিপি গ্যাং’ নামের যে গোষ্ঠী অনলাইনে আওয়ামী লীগের পক্ষে কাজ করার যে দাবি করেছিল সেটা দলটিকে সাহায্য করেনি, উলটো তাদের আচরণের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি বিনষ্টে ভূমিকা রেখেছে।

ডিজিটাল বাংলাদেশে অনলাইনে প্রচার-প্রচারণায় শক্তিশালী অবস্থান থাকা আবশ্যক। অনলাইনে বেশিরভাগ লোককেই আওয়ামী লীগ সমর্থক বলে দাবি করতে দেখা যায়। তবে এই দাবি কতটা আদর্শিক, কতটা স্বার্থ সংশ্লিষ্ট এ নিয়ে প্রশ্ন আছে। আওয়ামীপন্থী অ্যাক্টিভিস্ট বলে দাবি যারা করছে তাদের বেশিরভাগকেই সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মসূচিগুলো প্রচার করার চাইতে নিজেদেরকে উপস্থাপন আর ক্ষমতাবানদের তোষামোদের মাধ্যমে তাদের চোখে পড়ার চেষ্টা করতেই দেখা যায়। এটা দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে এবং আওয়ামী লীগ সরকারের কোন কাজে আসছে না।

লাখো অ্যাক্টিভিস্ট তৈরির যে উদ্যোগ নিয়েছে আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপকমিটি সামনের দিনগুলোতে এর আলোচনা আরও বেশি করে হবে বলে ধারণা। এই অ্যাক্টিভিস্টরা সত্যিকার অর্থে গুজব ও অপপ্রচার প্রতিরোধ, আওয়ামী লীগের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড প্রচারে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে কি না এটাই দেখার বিষয়।

 কবির য়াহমদ, কবি, লেখক | প্রধান সম্পাদক, সিলেটটুডে২৪.কম

  • খোলা জানালা বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। eyenews.news-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে eyenews.news আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।
Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়